Showing posts with label Golam Maula Rony. Show all posts
Showing posts with label Golam Maula Rony. Show all posts

কেনো আমি মনোনয়ন পত্র কিনলাম না!

গোলাম মাওলা রনি: আমার এলাকায় কয়েক লাখ লোক, দেশ বিদেশের শত সহস্র বন্ধু-বান্ধব ও শুভানুধ্যায়ীর একই প্রশ্ন- আমি কেনো আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পত্র কিনলাম না। নানা জনের নানা মত, নানা উপদেশ আর কারো কারো বিভিন্ন আশংকামূলক সতর্কবার্তা-এ সব নিয়ে আমার দিনকাল যেনো কেমন কেমন ভাবে দুলতে দুলতে পার হয়ে যাচ্ছে।

৫০ দিন জেল খাটার পর- নিজের বিশ্বাস, ভালবাসা আর নির্ভরতার জায়গায় প্রচন্ড একটি হোচট খেয়েছি। নিতান্ত নির্বোধ হবার পরও বুঝতে কষ্ট হয়নি- যার মুকুট মাথায় নিয়ে ঘোরাফেরা করতাম, তিনি তার সেই স্বীকৃতি ফেরত নিয়ে গেছেন জেলে ঢোকানোর মধ্য দিয়ে। ফলে জেল থেকে বের হবার পর সংসদে যায় নি। কারণ, আমার মনে হয়েছে ওখানে যাবার নৈতিক অধিকারের যে কেন্দ্র তা থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে কোন আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই।

দলটির সাথে আমার পারিবারিক সম্পর্ক সেই প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই। আর আমার সম্পর্ক শৈশব থেকে। যে আদর্শের কথা আমরা গর্ব ভরে প্রচার করি মনে প্রাণে সেই আদর্শ ধারণ করে কথাবার্তা, চালচলন ও বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে আসছিলাম। এখন মনে হচ্ছে প্রচারের বিষয় কখনো শতভাগ অনুসরণ করতে নেই।

দীর্ঘদিন বাজারে জোর গুজব ছিলো যে, আমাকে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হবে না। আমি বিশ্বাস করিনি। এমন কি জেলে যাবার পরও। কিন্তু জেল থেকে বের হবার পর দেখলাম অন্য এক দুনিয়া- দলের কেউই আমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। এমনকি আমার স্ত্রী উপযাচক হয়ে অনেকের সঙ্গে ফোনে কথা পর্যন্ত বলতে পারে নি। এক নাগারে পনের দিন চেষ্টা করেও গণভবনে ঢুকতে পারে নি। এই অবস্থায় ধরে নেয়াই স্বাভাবিক- আমাকে খরচের খাতায় ফেলে দেয়া হয়েছে।

বৃন্ত থেকে বিচ্যুত হওয়া ফুলই বুঝতে পারে তার কষ্ট। সেই কষ্টের সঙ্গে যদি নতুন অপমান জোটে তা আমি বা আমার পরিবার বা শুভানুধ্যায়ীদের পক্ষে বহন করা কষ্টকর হবে। অর্থ্যাৎ আমাকে মনোনয়ন দেয়া হবে না- এই ইঙ্গিতটি স্পষ্ট হয়েছে জেল থেকে বের হবার পর। তাই বেদনার পরিমান না বাড়িয়ে আত্ম মর্যাদা রক্ষার্থে নিরাপদ দূরে থাকাই বোধ হয় শ্রেয় হবে- এই ধারনার বশবর্তী হয়ে মনোনয়ন ফর্ম কিনলাম না।

অনেকে বলবেন- আপনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কি বা আপনি কি আদৌ নির্বাচন করবেন কি না? আমার বক্তব্য হচ্ছে- সামনের দিনগুলোই বলে দিবে আমার অবস্থান। কারণ- সময়, সুযোগ এবং আল্লার ইচ্ছা ব্যতিত কোন সফলতা মানুষের হাতে ধরা দেয় না। সেরকম কিছু হলে আমি অবশ্যই স্বতন্ত্র নির্বাচন করবো ইনশাআল্লাহ।

জয় বা পরাজয় নিয়ে আমি আদৌ চিন্তিত নেই। জয়ের ব্যাপারে খুবই আশাবাদী। আবার পরাজয় নিয়েও কোন মাথা ব্যাথা নেই। শতভাগ জয়ের স্বপ্ন দেখে কেবল কল্পনা বিলাসী কাপুরুষরা। জীবনের কোন কোন জয় যেমন পতন ডেকে নিয়ে আসে তেমনি কোন কোন পরাজয় অমিত জয়ের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করে দেয়- আমার জন্য কোনটি হবে তা আমি জানি না। জানতেও চাইনা। আমার কাজ কর্তব্য সম্পাদন করা। সফলতা বা ব্যর্থতা দেবার মালিক আল্লাহ। আল্লার কর্মটি বান্দারা যখন করতে চায় তখন আসমানের গজবের দরজাগুলো আপনা আপনি খুলে যায়- এই নির্মম সত্য আমাকে অনেক কিছু করা থেকেই বিরত রাখে।

আমি মনে করি দল হিসেবে এখনো আওয়ামী লীগই শ্রেষ্ঠ। সারা বাংলাদেশের কোটি কোটি নিবেদিত প্রাণ কর্মীদের সঙ্গে গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে থাকার মজাটাই আলাদা। আমি সেই আনন্দ থেকে নিজেকে পারতপক্ষে বঞ্চিত করবো না। আওয়ামী লীগের এই মুহুর্তের সবচেয়ে বড় সমস্যা কতিপয় অপরিপক্ক, বিশ্রী চরিত্রের এবং যাদের দেখলে বা কথা শুনলে মানুষের বমি বমি ভাব আসে কিংবা সারা শরীর চুলকানীর উদ্রেক হয় এমন সব মানুষ- যারা যোগ্যতার পরিবর্তে দালালী করে স্ব-স্ব স্থানে বসেছে এবং দূর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

ঐ সব লোকের কারণে আমি যদি দল থেকে দূরে চলে যাই তবে বঙ্গবন্ধুর আত্মা কষ্ট পাবে। আমার বিশ্বাস আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দূর্গন্ধ ছড়ানো নেতারা কোথায় যে যাবে তা নয়ে গবেষণার দরকার হবে। যদি যেনো তেনো নির্বাচন হয় তবেও তারা পাশ করবে না। আর তত্ত্বাবধায়ক কিংবা অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তারা মাঠেই যাবে না। আল্লাহ না করুন আরো কড়া বা কঠিন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে- তারা শুরু করবে দৌড়! সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তারপর চিন্তা করবে কেনো আসলাম, কোথায় আসলাম। কেউ কেউ হয়ত ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় স্বস্তিত হারাবে, কেউবা কাঁদবে- আর পথচারীরা দয়া পরবশ হয়ে তাদেরকে খাদ্য- পানীয় বা বস্ত্র দিয়ে সাহায্য করবে- যদি তখন তারা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে পারে।

সময়ের সাহসী সন্তানেরা সব সময় দলটির জন্য ত্যাগ করেছে- বারে বারে তারা ফিরে গেছে আপন কুঠুরিতে কেবল ত্যাগের জন্য। ভোগের জন্য নয়। এমনটিই হয়ে আসছে সেই পঞ্চাশের দশক থেকে আজ অবধি। আগামী দিনেও তাই হবে- যা হয়েছিলো অতীতে। সেই ত্যাগের সংগ্রামে একজন কর্মী হিসেবে পদচিহ্ন রাখার প্রত্যয় নিয়েই প্রার্থনা করছি -হে আল্লাহ! ভোগীদের জন্য তোমার ক্রোধ যেনো ত্যাগীদের প্রতি নিপতিত না হয়। ত্যাগীদের রক্ত, জীবন আর ধন-সম্পদের সর্বনাশ যেনো ভোগীদের অপকর্মের কাফফারা না হয়।
সূত্র: ফেসবুক স্ট্যাটাস

পরকীয়া নয় আপনকীয়া

পরকীয়া নিয়ে কিছু একটা লিখব- এ কথা শুনেই এক পরিচিত লোক বললেন- পরকীয়া বলছেন কেন। ওটা তো আপনকীয়া। এক ঘরের নিচে বাস করলেও স্বামী-স্ত্রী যেন একে অপরের থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব সমস্যাও আছে বটে। কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং ব্যক্তির মন-মানসিকতাও অনেকাংশে দায়ী পরকীয়া নামক এ ব্যাধির জন্য। আমি প্রথমে নিজের কিছু ঘটনা বলি- প্রায় ২৬ বছর হতে চলল আমার বিয়ের বয়স। প্রথম কয়েক মাস বেশ রং-রসের মধ্যেই কাটল। এরপর রূঢ় বাস্তবতা, অর্থকষ্ট। তারপর ছেলে সন্তানের জন্ম এবং তাদের মানুষ করার নিরন্তর প্রচেষ্টা। স্ত্রীর দিকে তাকাতেই ফুরসত পাইনি, অন্যদিকে তাকানো তো দূরের কথা। অথবা সুযোগই পাইনি বা আসেনি। আসলে কী হতো তা জানি না, এরই মধ্যে সিকি শতাব্দীর দাম্পত্য জীবনে আমরা একে অপরের মন্দগুলোই যেন ভালোবাসার পুষ্পমাল্য বানিয়ে নিয়েছি। যেমন আমার ভীষণ অপছন্দ নাক ডাকা। ইদানীং লক্ষ্য করলাম তিনি নাক ডাকছেন। অভিযোগ করতেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠার অবস্থা। উল্টো অভিযোগ, আমি নাকি নাক ডাকি এবং তা ট্রাকের ইঞ্জিনের শব্দকেও ফেল করে। কি আর করা। কখনো ঘুম ভেঙে গেলে ওই শব্দ শুনে পছন্দের রবীন্দ্রসংগীত মনে করে ছন্দ মেলাতে শুরু করলাম। চিৎ হয়ে শুয়ে নিজের পেটটাকে তবলা বানিয়ে ছন্দে অতিরিক্ত লালিত্য মেশানোর চেষ্টা করলাম। ওষুধের মতো কাজ দিল। এখন অভ্যাস এমন হয়ে গেছে যে মাঝেমধ্যে ওই ছন্দময় গীতসংগীত শ্রবণের জন্যই হয়তো বা মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়।

যা বলছিলাম; পরকীয়া। পরিচিতজনদের কাছে এসব কথা শুনি। খুবই রগরগে। আমার মতো নিরামিষভোজীও উত্তেজিত হয়ে উঠি। ভয়ঙ্কর সব লালসার গল্প। নিজে যেরূপ অন্যায়ের পথে সমর্পিত হচ্ছে, তদ্রূপ ইচ্ছা করেই স্ত্রী, কন্যা, পুত্রবধূদের অনৈতিক কাজে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি। মদ, জুয়া ও অশালীনতার শত সহস্র আসর ঢাকার অভিজাত পল্লীগুলোতে জমজমাট হয়ে ওঠে; বিশেষত সন্ধ্যার পর। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের মানসিকতা। কোনো মানুষ যে পরকীয়া দোষে দোষী নয়- এ কথা আর বিশ্বাস করানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশ প্রতিদিনে আমার দুটি লেখা ছাপা হওয়ার পর আমি এত টেলিফোন এবং প্রতিক্রিয়া পেলাম যে তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। প্রথম লেখাটি ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা, অন্তরালে যৌনতা এবং দিনান্তের পতন। মূলত এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক লেখা। রাজা-বাদশাদের অনৈতিক, প্রেম ও দুর্ভাগ্যজনক পরিণতির কয়েকটি উপাখ্যান। অনেক রাজনৈতিক নেতার স্ত্রী ফোন করে তাদের স্বামীদের অপকর্মের কথা বলল, এমনকি নামধাম প্রকাশ করে আমাকে তাদের দুঃখের কাহিনী প্রকাশ করতে বলল। কয়েকজন ফোন করে দেখা করতে চাইল। নিজেদের সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের রক্ষিতা বলে পরিচয় দিল এবং তাদের কাহিনীগুলো আমাকে জানাতে চাইল।

অন্য একটি লেখা ছিল- 'শাওনের কান্না, মিলি ভাবী এবং আমার প্রেম'। এটাও অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল। বন্ধুবর সম্পাদক নঈম নিজামের প্রতি ভীষণ রাগ হলো। কারণ শিরোনামটি তারই দেওয়া- আমারটি ছিল অন্যরকম। যারা পড়ল তারা বিভিন্নভাবে ঘটনাটি ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করল। যারা শুধু শিরোনাম পড়ল তারা আমাকে সরাসরি চরিত্রহীন ভাবল। অনেকে আবার অন্যের মুখে শুনে আমাকে বাঁকা হাসি দিয়ে প্রশ্ন করল, আমি প্রমাদ গুনলাম স্ত্রী মহোদয়াকে নিয়ে। ঢাকার বাইরে ছিলাম। এসে বুঝলাম সে পড়েনি। শাওন মানে লেখক হুমায়ূন আহমেদের বিধবা স্ত্রী। কোনোদিন কথাও হয়নি কিংবা চাক্ষুষ দেখিনি। তার মা আমাদের সহকর্মী। সবাই অভিযোগ করছে, শাওন কেবল অর্থলোভেই হুমায়ূনকে বিয়ে করেছে। আমার মনে হলো, এটা ঠিক নয়। সে সত্যি অর্থেই হুমায়ূনের মেধা ও লেখক প্রতিভাকে ভালোবেসেছে। তার বয়সে সে স্বাভাবিকভাবেই সুদর্শন কোনো যুবককে ভালোবাসবে। অন্যদিকে অর্থের জন্য ভালোবাসার তো প্রশ্নই আসে না। যে কারণে মানুষের অর্থলোভ হয় সেটি তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সে ধনীর মেয়ে এবং হুমায়ূন আহমেদের বিত্ত-বৈভবের তুলনায় তার পৈতৃক ধনসম্পত্তি অনেক বেশি। অন্যপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাজহারকে নিয়ে যে সন্দেহ অনেকে করছে তাও আমার কাছে বিকৃত রুচির মানসিকতাই মনে হয়েছে। যে মানুষটি অসুস্থ হুমায়ূনের শিয়রে ছিলেন বছরের পর বছর। ব্যয় করেছেন কোটি কোটি টাকা। ব্যবসা, বাণিজ্য, অফিস ছেড়ে যেভাবে তিনি হুমায়ূন আহমেদের পাশে থেকেছেন- সেই দৃষ্টান্ত আমি নিকট বর্তমানে দেখিওনি কিংবা শুনিওনি। কাজেই মানবিকতাবোধ থেকেই তাদের পক্ষে লিখেছি। কিন্তু সমাজের বিকৃত মানুষেরা সরাসরি আমাকেই আক্রমণ করে বসল। কেউ বলল- আপনি কে? আপনার লেখার কী দরকার ছিল! আপনার তো একটি ইমেজ রয়েছে। কেন এসব ফালতু বিষয় নিয়ে লিখতে গেলেন ইত্যাদি। অদ্ভুত একটি এসএমএস পেলাম অজানা জায়গা থেকে। সে লিখেছে- 'তোর গায়ের রং যেমনি কালো, তেমনি তোর অন্তরটা আরও কালো। তাই কালিয়ার খোঁজে নেমেছিস।'

অদ্ভুত এই বিচিত্র সেলুকাসের দেশে মানুষের মন যে কিরূপ বিকৃত হয়ে পড়েছে তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। বিষয়টি নিয়ে অনেকের সঙ্গে আলোচনা করলাম এবং পরকীয়ার মনস্তাত্তি্বক কিছু বিষয় বোঝার চেষ্টা করলাম। ইচ্ছা ছিল খুশবন্ত সিংয়ের মতো নিজের জবানিতে লিখব। কিন্তু সম্মানিত পাঠকদের কথা ভেবে সাহসী হলাম না। একটি কল্পিত চরিত্রের মাধ্যমে আমার দেখা সমাজের কিছু দৃশ্যের কথা আপনাদের বলছি- জয়নাল সাহেব এখন বেশ সচ্ছল। বয়স আনুমানিক পঞ্চাশের কাছাকাছি। ব্যবসা করেন। লোকজন তাকে ভালো মানুষ হিসেবেই জানে। সত্তরের দশকে প্রথম সিনেমা দেখেন রূপবান। নায়িকা সুজাতাকে তার খুবই পছন্দ হয়। সিনেমাটিতে রূপবানের বয়স ১২ বছর আর নায়কের বয়স ১২ দিন। জয়নাল সাহেবের সেই থেকেই চিন্তা- ১২ দিনের ছেলে রহিমের যদি বিয়ে হতে পারে, তবে ১৪ বছরের জয়নালের কেন নয়। সে সিনেমাটি কয়েকবার দেখল। গানগুলো সব মুখস্থ হয়ে গেল। তার নায়িকা রূপবানকেও ভালো লাগল, আবার ভিলেন নায়িকা তাজেলকেও ভালো লাগল। তার প্রশ্ন জাগল, দুটি বউ থাকলে কি এমন হয়! তার দাদার তো চারটা বউ রয়েছে। যেই কথা সেই কাজ- ১৪ বছরের কিশোর জয়নাল হন্যে হয়ে পাত্রী খুঁজতে লাগল। খুঁজতে লাগল মানে প্রেম করার সুযোগ খুঁজতে লাগল। সময়টা সত্তরের দশক। সমাজ অনেকটা কনজারভেটিভ। মেয়েরা আরও বেশি। জয়নাল সাহেব যত বেশি বেশি মেয়েদের দিকে তাকায় তারা ততই বিরক্ত হয়। কয়েকটি মেয়ে তাদের অভিভাবকের কাছে নালিশ করল। কেউ কেউ স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের কাছে অভিযোগ করল। জয়নালকে শিক্ষকরা বেশ মারল। মার খেয়ে তার প্রেমাকাঙ্ক্ষা আরও বেড়ে গেল। বিশেষত হিন্দু মেয়েদের প্রতি তার মোহ ছিল বেশি। কেন জানি হিন্দু মেয়েদের তার খুব রূপসী মনে হতো। আর প্রায় সব হিন্দু মেয়েই গান জানে। জয়নাল সাহেব আবার শৈশব থেকেই ছিলেন সংগীতপ্রিয়।

কথায় আছে- মানুষ যা আকাঙ্ক্ষা করে এবং চেষ্টা করে, ফলাফল সেরকমই হয়। জয়নাল সাহেব বিয়ে করে ফেললেন অল্প বয়সেই। প্রথম কয়েক মাস খুব রং-রসের মধ্যে গেল। স্ত্রী সুন্দরী, অনুগতা এবং পতিব্রতা। বেশ ভালোই যাচ্ছিল। কিন্তু বিপত্তি বাধাল রূপবান সিনেমার কাহিনী। জয়নাল সাহেবের বার বার মনে হচ্ছিল, খল নায়িকা তাজেলের কথা। তার মনে হলো তাজেলের মতো আরেকটা মেয়ে পেলে মন্দ হতো না। চুপি চুপি কিছুদিন প্রেম করবে। তারপর একদিন বিয়ে করবে। দুই বউ। বেশ মজাই হবে। জয়নাল সাহেব মনে মনে ভীষণ উত্তেজিত। কল্পিত তাজেলকে সে পাশে বসায়, খাইয়ে দেয়। মাঝেমধ্যে খুনসুঁটিও করে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময়। স্ত্রী বকা দেয়- কেন সে শুয়ে শুয়ে একা একা বিড় বিড় করে! জয়নাল সাহেবের পরিবার বেশ ধর্মপরায়ণ। জয়নাল সাহেবও তদ্রূপ। বিয়ের কিছুদিন পরই সে দাড়ি রাখা শুরু করল।

তাজেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করার জন্য জয়নাল সাহেব উঠেপড়ে লাগল। সময় পেলেই বিভিন্ন মার্কেটে যায়। সেখানে অনেক মেয়ে দেখে কিন্তু পছন্দ হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজের সামনেও অনেক ঘুরল। এবার অনেককে পছন্দ হলো। কিন্তু কীভাবে তাদের সঙ্গে প্রেম করবে তা ভেবে পেল না। নিজের ক্লিন ইমেজের জন্য বিষয়টি বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গেও আলোচনা করতে পারছে না। পরিকল্পনা করতে হচ্ছে নিজে নিজেই। সে ভাবল টেলিফোনে রং নাম্বারে ফোন করে হয়তো কোনো ফল পাওয়া যেতে পারে। যেই কথা সেই কাজ। প্রতিদিন বিকালে এক ঘণ্টা সময় নিয়ে সে গুলশান, বনানী ও ধানমণ্ডির ফোন নম্বরগুলোতে চেষ্টা করতে থাকল। এবার সে প্রতিজ্ঞা করল- যেহেতু রিস্ক নিয়ে প্রেম করবে সেহেতু প্রেমিকাকে হতে হবে ধনীর কন্যা, সুন্দরী এবং কিছুটা দেমাগী- অনেকটা তাজেলের মতো। চেষ্টা চলল। কিন্তু সহসা কিছু হলো না। জয়নাল সাহেব হাল ছাড়লেন না। এরই মধ্যে ধানমণ্ডির একটি নম্বরে কাঙ্ক্ষিত কাউকে পেয়ে গেলেন। কিশোরী মেয়ে। সবে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। জয়নাল সাহেবের তুলনায় ১২ বছরের ছোট। জয়নাল সাহেব নিজের বয়স কমিয়ে বললেন। মজার মজার কথা এবং নিজের পরিণত বয়সের চাতুরীমূলক অভিজ্ঞতার অভিনব বর্ণনে তিনি মেয়েটাকে প্রায় পাগল বানিয়ে ফেললেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে প্রেমালাপ। এভাবে চলল প্রায় ১৫ দিন। মেয়েটির সুললিত কণ্ঠ এবং বংশ-পরিচয় তার খুবই পছন্দ হলো। টেলিফোনে উচ্চতা, গায়ের রং, চুলের স্টাইল, আত্দীয়স্বজন এবং আর্থিক অবস্থার বিবরণ নিলেন। সবই পছন্দের। এবার চর্মচক্ষে দেখার পালা। কিশোরীও পাগলপ্রায়। জয়নাল সাহেব চিন্তা করেন কীভাবে মেয়েটাকে ভাগিয়ে নিয়ে বিয়ে করা যায়। আইনগত বাধা ছিল না, কারণ তখনো বাল্যবিবাহ বা বহুবিবাহ নিরোধ আইনটি হয়নি। বাধা শুধু সামাজিক। জয়নাল সাহেব ভাবলেন- পালিয়ে কোথাও চলে গেলে এবং বিয়ে-থা হয়ে গেলে বোধহয় তেমন সমস্যা হবে না। উভয়ের সম্মতিতে দেখা-সাক্ষাতে দিনক্ষণ ঠিক হলো। মেয়েটি এলো। জয়নাল সাহেবও গেলেন। কিন্তু একে অপরকে দেখার পর উভয়েই হতাশ হলেন। মেয়েটি জয়নাল সাহেবের বয়স, উচ্চতা এবং দাড়ি দেখে মনে মনে বিরক্ত হলো। জয়নাল সাহেবের আত্দসম্মানে ভীষণ লাগল। অন্যদিকে জয়নাল সাহেব যেমনটি আশা করেছিলেন মেয়েটি তেমন সুন্দরী ছিল না। বিশেষত তার উপরের পাটির দাঁত একটু উঁচু থাকায় বার বার শুধু নিজের রূপবানের কথাই মনে পড়ছিল। আলোচনা জমল না, ঘণ্টাখানেক ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে এলোমেলো ঘোরাফেরা করে তারা যে যার স্থানে ফিরে এলো। এরপর কয়েকদিন টেলিফোনে হালকা কথাবার্তা হলো। কিন্তু জমল না। জয়নাল সাহেব রাগের চোটে দাড়ি কামিয়ে ফেললেন। লোকজন জিজ্ঞাসা করল হায়! হায়! এটা কী করলে। জয়নাল সাহেব বললেন- দেশের অবস্থা ভালো না। দাড়িওয়ালা যুবকদের দেখলেই লোকজন ছাত্রশিবিরের কর্মী মনে করে- তাই দাড়ি কামিয়ে ফেললাম। তাজেলের খোঁজে জয়নাল সাহেব যখন প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন তখন রূপবানের ঘরে দুটি সন্তান জন্ম নিল। বিবাহিত জীবনেরও প্রায় ১৪-১৫ বছর হতে চলল। ইতোমধ্যে রূপবানরূপী স্ত্রীর রূপেও কিছুটা ভাটা পড়েছে। সাংসারিক কাজে প্রায়ই খটর-মটর লাগে। স্ত্রী ঝগড়া শুরু করল। মাঝেমধ্যে গালিও দেয়। আর ঝগড়া লাগলে স্ত্রী গ্রাম্যভাষায় তুই-তুকারি শব্দ ব্যবহার করে। ধর্মভীরু জয়নাল সাহেব নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকল- হায় আল্লাহ, এই ডাইনিটা যেন মারা যায়। এভাবেই চলছিল। কিন্তু এর মধ্যে সে জানল যে, কারও জন্য মৃত্যু কামনা করলে নাকি তার আয়ু বাড়ে। সে ভয় পেয়ে গেল। এখন কি হবে। সে কি স্ত্রীর দীর্ঘায়ু কামনা করবে। স্ত্রীর দীর্ঘায়ু চেয়ে মোনাজাত করার চেষ্টা করল। কিন্তু মন সায় দেয় না। সিদ্ধান্ত নিল, এ ব্যাপারে সে আল্লাহকে কিছুই বলবে না। যাই হোক সে ঘরে সময় কম দেওয়া শুরু করল এবং তাজেল খোঁজার কাজ পুনরায় আরম্ভ করল। ইতোমধ্যে জয়নাল সাহেব ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ প্রসার লাভ করেছেন। ব্যবসায়ী সমাজে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছেন। অনেক ধনাঢ্য ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার সখ্যও গড়ে উঠেছে। বিদেশেও যাওয়া পড়ছে ঘন ঘন। অনেক পরিচিতজনের জীবনই দেখলেন অশ্লীলতায় পূর্ণ। তারা বিভিন্ন মহিলার সঙ্গে অবৈধ প্রণয় করছে। শারীরিক মেলামেশা করছে। অনেকে এই প্রণয়কর্মের জন্য আলাদা বাড়ি কিংবা বাগানবাড়িও নির্মাণ করেছে। অনেকে আবার পাঁচতারা হোটেলগুলোকে ব্যবহার করছে দিনে কিংবা রাতে। পুরুষদের প্রণয়ের সঙ্গী হচ্ছে বিবাহিত মহিলারা, বিশেষত ধনাঢ্য পরিবারের মহিলারা। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু তরুণীও শয্যাসঙ্গী হচ্ছে- তবে অর্থের বিনিময়ে। এর বাইরে হাই সোসাইটির কলগার্লদের সঙ্গেও কিছু পরিচিত ব্যবসায়ীর নিয়মিত যোগাযোগ তার দৃষ্টিগোচরে এলো। কিছু রসিক ব্যবসায়ী আবার দেশ-বিদেশের পরিচিত নায়িকা বা মডেল কন্যাদের সঙ্গে তাদের দহরম-মহরমের রসালো গল্প জয়নাল সাহেবের কাছে বলল। কিন্তু এসব কোনো কিছুই তাকে আকর্ষণ করল না। সম্ভবত আজন্ম কঠিন পারিবারিক শিক্ষা ও নীতি-নৈতিকতাবোধ তাকে অবাধ যৌন সম্পর্কের ব্যাপারে আগ্রহী করল না। বন্ধুরা তাকে বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করল। কেউ কেউ নিজেদের বান্ধবীদের উপহার প্রদানের কথা বলল। কেউ কেউ আবার বলল- যাও পারলে আমার স্ত্রীর সঙ্গে প্রেম কর, কিছু বলব না। জয়নাল সাহেব মনে মনে 'লা হাওলা' পড়েন। এসব অশ্লীল মানুষকে এড়িয়ে চলা আরম্ভ করলেন। ফলে বেশ কিছু দিন তার মন ভারি হয়ে রইল। এদিকে জয়নাল সাহেবের স্ত্রীর সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়তেই থাকল। নিজের বংশ-আভিজাত্য ধর্মবোধ এবং পারিবারিক শিক্ষার কারণে তিনি চাইলেন স্ত্রীর সঙ্গে একটি মোহময় ও প্রেমময় সম্পর্ক গড়ে তোলার। কিন্তু স্ত্রী যেন কেমন। সবকিছুতেই তার একটা গেঁয়ো ভাব। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে প্রেম-রোমান্টিকতা যে থাকতে পারে তা ভদ্রলোকের স্ত্রী বুঝতেই চান না। রান্না-বাড়া, ঘরের কাজ, সন্তান-সন্ততি দেখাশোনা করা এবং কালেভদ্রে স্বামীর শয্যাসঙ্গী হওয়াকেই তিনি তার দায়িত্ব মনে করেন। অন্যদিকে জয়নাল সাহেব চান স্ত্রীর সঙ্গে সব বিষয় শেয়ার করতে। নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য, ভালোলাগা সবকিছুই স্ত্রীকে বলতে চান। কিন্তু এতে স্ত্রী ভীষণ বিরক্ত হন। জয়নাল সাহেব যদি দীর্ঘক্ষণ নামাজ পড়েন কিংবা বই পড়েন বা গান শোনেন- সব কিছুতেই স্ত্রীর আপত্তি। স্ত্রী চান জয়নাল সাহেব যেন ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেন। সকাল-বিকাল পালা করে তাদের পড়ান। স্কুলে নিয়ে যান। ঘরের কাজে স্ত্রীকে সাহায্য করেন। বাজারঘাট নিয়মিত করেন ইত্যাদি। জয়নাল সাহেবের বক্তব্য, ওইগুলো তো টাকা দিয়েই করা যায়। ঘরের কাজ বুয়ারা করবে। রান্নার কাজ বাবুর্চি করবে। ছেলেমেয়েদের জন্য গৃহশিক্ষক রাখা হবে। নাহ, তা হবে না- স্ত্রীর সাফ জবাব। জয়নাল সাহেব অনেক কষ্ট করে গ্রাম থেকে কাজের ছেলে বা মেয়ে আনেন। আর স্ত্রী মারধর করে তাড়িয়ে দেয়। এ নিয়ে গ্রামে জয়নাল সাহেবের স্ত্রীর বদমেজাজের বেশ সুখ্যাতি হয়ে গেছে। গ্রাম থেকে আর কাউকে আনা যাচ্ছে না। ফলে ভদ্র মহিলাকে সব কাজ একাকীই করতে হয়। এ নিয়ে জয়নাল সাহেবের স্ত্রীর প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই। বরং প্রচণ্ড রাগ হয়। কাজের লোকদের সঙ্গে ঝগড়াঝাটি তিনি একদম পছন্দ করেন না। আর স্ত্রীর এ ধরনের গৃহকর্মে মনোনিবেশও তার অপছন্দ। তিনি চান স্ত্রী তার অফিসে মাঝেমধ্যে আসুক। সামাজিক জীবনের সঙ্গিনী হোক এবং অবসরে তার সঙ্গে প্রেম করুক। কিন্তু স্ত্রীর ভালোবাসা যেন গৃহকোণে বন্দী থাকার মধ্যে এবং সারা দিনের কর্মশেষে যখন জয়নাল সাহেব বাসায় ফেরেন তখন তার সঙ্গে ঝগড়া করার জন্য নিত্যনতুন পরিকল্পনা প্রণয়নের মধ্যে। ফলে দূরত্ব বাড়তেই থাকে। অন্যদিকে জয়নাল সাহেবের মনও তাজেলের খোঁজে পুনরায় অস্থির হায় ওঠে। মনের মতো আরেকটা বউ পাওয়ার জন্য জয়নাল সাহেবের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তার রোমান্টিক মন। সে বিয়ে করার আগে বউয়ের রোমান্টিকতা যাচাই করতে চায়। এ জন্য দরকার প্রেম করা। অন্যদিকে বর্তমান স্ত্রী বা সন্তানদের প্রতি দায়িত্ববোধও তাকে তাড়িত করে। স্ত্রী ও সন্তানদের সে প্রচণ্ড ভালোবাসে। স্ত্রীকে মনের মতো করে না পাওয়ার বেদনা থেকেই সে বিকল্প কিছু একটা খুঁজছে। খোঁজাটা আবার যেনতেন নয়। সে চাচ্ছে তার হবু দ্বিতীয় স্ত্রী রূপ-গুণ-বংশ মর্যাদায় তার প্রথম স্ত্রীর তুলনায় শ্রেষ্ঠ হোক। বর্তমান স্ত্রী প্রায়ই তাকে খোটা দেয়- আমার মতো স্ত্রী আর পাবে না। মরলে দেখো, আরও একটা বিয়ে করে দেখো, তোমার যে অভ্যাস- আমি বলে ঘর করে গেলাম। অন্য মহিলা হলে একদিনও তোমার সঙ্গে থাকতে পারবে না ইত্যাদি। জয়নাল সাহেব উত্তর দেন না। কিন্তু মনে মনে জিদ ধরেন- যা থাকে ভাগ্যে! কিছু একটা এবার করে দেখাতেই হয়। এদিকে বয়স বেড়ে যাচ্ছে। চুলেও পাক ধরেছে। এ অবস্থায় কী করে আরেকটি বিয়ে করা যায়। বিষয়টা নিয়ে এক বন্ধুর সঙ্গে সে খোলামেলা আলোচনা করলেন। বন্ধু বললেন- আরে বোকা, যারা দ্বিতীয় বিয়ে করে তারা কখনো প্রথম স্ত্রী নিয়ে এত ভাবে না। হঠাৎ করে ফেলে। কিন্তু কীভাবে? বন্ধু বলে বিয়ের কথা গোপন রেখে কারও সঙ্গে প্রেম কর, অথবা বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বল যে, তোমার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না ইত্যাদি ইত্যাদি। সবই তো বুঝলাম- বলেন জয়নাল সাহেব। কিন্তু যাব কোথায়? তাকে পাব কোথায়? একবার সিদ্ধান্ত নেয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেবেন। কিন্তু সাহস হয় না। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেন, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈকালিক সেশনে এমবিএ-তে ভর্তি হবেন। উদ্দেশ্য সেখানে হয়তো কোনো সুন্দরী এবং যোগ্য মেয়েকে পাওয়া যেতে পারে। হোক না বিধবা, কিংবা তালাকপ্রাপ্ত। দু'একটি সন্তান থাকলেও আপত্তি নেই। আগে কুমারী বা অবিবাহিত কাউকে কল্পনা করা যেত। এখন আর সম্ভব নয়। যেমন চিন্তা তেমন কাজ। একটি স্বনামধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। খরচ পড়ল প্রায় ৫০ হাজার টাকা। প্রথম দিন ক্লাসে যাওয়ার আগে উত্তেজনায় ঘুমাতে পারলেন না। না জানি কতজন মেয়ে ভর্তি হয়েছে। তারা দেখতেই বা কেমন হবে। তার সঙ্গে প্রেম করবে তো। ইত্যাদি চিন্তা করতে করতে নির্ঘুম রাত অবশেষে পোহাল। সারাদিন গেল উত্তেজনায়। অবশেষে বিকালে ক্লাসে গেলেন জয়নাল সাহেব। ওরে বাবা, একি! প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মেয়ে মাত্র চার-পাঁচজন। তাও আবার একে অপরের চেয়ে কুৎসিত। এর মধ্যে সবচেয়ে কুৎসিত মেয়েটি জয়নাল সাহেবের পাশে বসল। একেবারে গাঘেঁষে। বয়সও তো মনে হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। গা থেকে ঘামের গন্ধ আসছিল। জয়নাল সাহেব তাকাতে ভয় পাচ্ছিলেন। মেয়েটিই উদ্যোগী হয়ে কথা বলল। মুখ থেকে দুর্গন্ধের ঝাপটা জয়নাল সাহেবকে আক্রমণ করল। তিনি ওয়াশ রুমে যাওয়ার কথা বলে ক্লাসরুম ছাড়লেন। আর কোনোদিন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দিয়েও হাঁটেননি।

জয়নাল সাহেবের ক্লান্ত এই প্রেমযাত্রায় সত্যিই এবার ফুল ফুটল। এক ভদ্র মহিলার সঙ্গে হঠাৎ পরিচয় হলো। বেশ সুন্দরী ও লম্বা। গায়ের রং দুধে আলতা। ঠিক যেমনটি তিনি কল্পনা করতেন। বংশও ভালো। ব্যবসা করেন। বোরকা পরেন, কিন্তু নিচে জিন্স প্যান্টও পরেন। নিজে গাড়ি ড্রাইভ করেন। নামাজ-কালাম, কোরআন পড়া, নফল ইবাদত-বন্দেগি, রোজা রাখার মতো ধর্মীয় গুণাবলীর সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক গানের গলাও বেশ দরাজ। বিবাহিত। বয়স ২৮-২৯ বছর হবে। দুটো সন্তান রয়েছে। স্বামীর সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না। ধর্মভীরু জয়নাল সাহেব মনে করলেন, এবার বোধহয় আল্লাহপাক তার প্রতি রহম করেছেন। আলাপ জমে উঠল- ফোনে ফোনে। কারণ দেখা হয়েছে মাত্র একবার এবং তিনি পর্দার কারণে দেখা-সাক্ষাতে আগ্রহী নন। প্রেয়সীর বয়স যেহেতু কম, সেহেতু জয়নাল সাহেবকেও শারীরিকভাবে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তিনি নিয়মিত ব্যায়াম শুরু করলেন। ডাক্তারের কথামতো সন্ধ্যা ৮টার মধ্যে খাবার খান। এরপর হাঁটতে বের হন। টানা দেড় ঘণ্টা হাঁটেন ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে। হাঁটতে হাঁটতে যখন জাহাজ মার্কা বাড়ির সামনে দাঁড়ান তখন সেখানে প্রেমরত তরুণ-তরুণীদের দিকে আড় চোখে তাকান। বেশ জড়াজড়ি করে তারা বসে থাকে। কী করে অন্ধকারে তা স্পষ্ট দেখা না গেলেও বোঝা যায় আপত্তিকর কিছু একটা করছে। আগে খুব রাগ হতো এ ধরনের দৃশ্য দেখলে। মনে হতো একটি লাথি দিয়ে ওদের তাড়িয়ে দেন। কিন্তু এখন হয় না। বরং এক ধরনের মায়া লাগে। আহারে! বেচারারা কোনো সুযোগ পাচ্ছে না। সে মনে মনে ভাবে বিয়ের পর নববধূকে নিয়ে প্রায়ই সে ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে বসবে। বিশেষত জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাতে। বাদাম কিংবা পপকর্ন খাবে এবং পছন্দের গানগুলো তাকে গেয়ে শোনাবে। এভাবেই চলল প্রায় ১৫-২০ দিন। এরই মধ্যে ঘটে গেল আরেক দুর্ঘটনা। জয়নাল সাহেবের দীর্ঘদিনের পরিচিত এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। খানিকটা প্লেবয় প্রকৃতির। কথা প্রসঙ্গে জানাল, সে তার হবুবধূ বন্ধুটির বেশ পরিচিত। নিজের মনের কথা গোপন রেখে সে মেয়েটির খোঁজখবর জানতে চাইল। সমাজে সৎ মানুষ হিসেবে যেহেতু জয়নাল সাহেব ব্যাপক পরিচিতি এবং বিশ্বস্ততা রয়েছে, তাই বন্ধুটি কোনো সন্দেহ করল না। বরং নির্দ্বিধায় মেয়েটির ইতিহাস বর্ণনা করল। জানা গেল, মেয়েটি মূলত হাই সোসাইটির কলগার্ল। সমাজের অনেক বিত্তবানকে সে সর্বনাশ করেছে। কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না জয়নাল সাহেবের। বন্ধুটি কয়েকজনের নাম বললেন এবং এও বললেন- কে কত টাকা ওই মেয়ের পেছনে খরচ করেছে। জয়নাল সাহেব এসএমএস দিয়ে মেয়েটিকে ঘটনার সত্যতা জিজ্ঞাসা করলেন এবং মেয়েটিও নির্দ্বিধায় সব স্বীকার করল। মাথায় যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো জয়নাল সাহেবের। মনের দুঃখে তিনি চলে গেলেন ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে সেই জাহাজ মার্কা বাড়িটির কাছে। রাত তখন প্রায় ১১টা। কোনো প্রেমিক জুটিই সেখানে ছিল না। কেবল জয়নাল সাহেব একা। আনমনে তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে। জ্যোৎস্নাপ্লাবিত চাঁদের দিকে। কোনো খেয়াল ছিল না। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেলেন; কাঁধে কার যেন শক্ত হাতের স্পর্শে। তাকিয়ে দেখলেন একজন হিজড়া তার ঘাড়ে হাত রেখে অশ্লীলভাবে হাসছে। ভয়ে জয়নাল সাহেবের মুখ পাংশু বর্ণ হয়ে গেল। কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে গেছে। চিৎকার দিয়ে কাউকে ডাকবেন সেই শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন...।
প্রকাশঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন, শুক্রবার ২৬ অক্টোবর ২০১২

এই সরকার পদ্মা সেতুর একটি খুঁটিও গাড়তে পারবে না

বিশেষ সাক্ষাৎকার : গোলাম মওলা রনি
গোলাম মওলা রনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পটুয়াখালীর একটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তরুণ এই সংসদ সদস্য ব্যাপক আলোচনায় এসেছেন নিজ দলের অনেক মন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে। তিনি কালের কণ্ঠের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরিফুজ্জামান তুহিন

কালের কণ্ঠ : ২৩ দফা দিয়ে আপনারা ক্ষমতায় এসেছেন; কিন্তু একটি দফাও আপনারা পূরণ করতে পারেননি। কেন?
গোলাম মওলা রনি : আসলে বাংলাদেশে যাঁরা নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করেন, মাঠের রাজনীতি ও প্রকৃত বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণা নেই। এটা শুধু আওয়ামী লীগ-বিএনপি নয়, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে সত্য। এ কাজটি করেন একধরনের বুদ্ধিজীবী, যাঁদের 'হরবোলা' বলা হয়। তাঁরা হল ভাড়া করা বুদ্ধিজীবী। মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য কাব্য দিয়ে তাঁরা এসব নির্বাচনী ইশতেহার বানান। এভাবে গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩ দফা নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছিল, যা বাস্তবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। যেমন প্রতিটি পরিবারে একজনকে চাকরি দেওয়া- এটা পৃথিবীর কোনো দেশ কখনোই পারবে না। অথচ বিষয়টি কিন্তু এমনভাবে বলা যেত, সরকার এমন একটি অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করবে, যাতে প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজন প্রত্যক্ষভাবে হোক অথবা পরোক্ষভাবে হোক, অর্থনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন।
তবে এই সরকারের কিছু অবিস্মরণীয় কাজ রয়েছে, যা শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত নয়, সারা পৃথিবীতে ব্যতিক্রম। এর মধ্যে একটি হলো পাটের জেনম আবিষ্কার। পাশাপাশি ছত্রাকের আক্রমণের কারণ আবিষ্কার করা গেছে। এটা কিন্তু সারা পৃথিবীতে আর কেউ পারেনি। এর ফলে বাংলাদেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন বেড়ে যাবে।
পাকিস্তান আমলে আমাদের দেশে শিল্পকারখানা তৈরি হয়েছে। সেখানে প্রচুর শ্রমিক কাজ করতেন। বাংলাদেশে যে গার্মেন্টগুলো চলছে, সেগুলো কিন্তু শিল্প নয়। কোনো গার্মেন্ট মালিক কিন্তু বলতে পারবেন না, আমাদের এখানে প্রভিডেন্ট ফান্ড আছে, বীমা আছে, গ্রাচুইটি আছে। এসব শিল্প নয়, এগুলো সব বোগাস। গার্মেন্ট, এই অর্থনীতি টলটলায়মান। এ অবস্থা থেকে সরকার মাইক্রো লেভেলে, কৃষিতে ব্যাপক মনোযোগ দিয়েছে। কৃষি একটা শিল্প। ফলে কৃষকরা নানা ধরনের নতুন নতুন ফসল উদ্ভাবন করছেন, যা দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে। এ সরকারের এটাই সফলতা।
সরকার যখন ক্ষমতায় আসে তখন কিন্তু বিদ্যুতের হাহাকার ছিল। এখন কুইক রেন্টালের যে সমালোচনা আছে, সেটা ঠিক আছে। মানুষ কিন্তু বিদ্যুৎ পাচ্ছে। এই সরকারের আমলে কিন্তু ৭০ হাজার কিলোমিটার সড়ক আমরা মেরামত করেছি। ৬০টির মতো দরিদ্র ভাতা রয়েছে, যা আমরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিয়েছি। শিক্ষা খাতেও আমাদের সাফল্য রয়েছে।
আমরা রাস্তাঘাট আশা করি ইংল্যান্ড-আমেরিকার মতো; কিন্তু ট্যাক্স দিই বাংলাদেশের মতো। তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না।
কালের কণ্ঠ : আপনার দাবি অনুযায়ী আপনাদের সরকারের অনেক সাফল্য রয়েছে। সেগুলো কেন প্রচার করছেন না?
গোলাম মওলা রনি : আওয়ামী লীগের প্রচার বিভাগ মারাত্মক দুর্বল। সরকারের বিভিন্ন প্রচার বিভাগ ও পার্টির প্রচার বিভাগের মধ্যে যে সমন্বয় থাকবে, তা হয়নি। ফলে সরকারের সাফল্যগুলোর কোনো প্রচার নেই। আমাদের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক, ঢাকা মহানগর প্রচার সম্পাদক অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ প্রচার বিভাগগুলো নিষ্ক্রিয়। সরকারের যে উন্নয়নমূলক কাজ, তা দলের প্রচার বিভাগের কাছে নেই। তারা কী করে সরকারের সাফল্য প্রচার করবে?
এ কাজটি করার মতো যে দক্ষতা, তা কিন্তু প্রচার বিভাগের নেই। আপনি এখনই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক নূহ উল লেনিন সাহেবের কাছে যান, তাঁকে গিয়ে আই ফোন-৪-এর বিষয় কথা বলেন, তিনি কিছু বলতে পারবেন না। সরকার চায় ডিজিটাল বাংলাদেশ আর তার আশপাশের মানুষ হলো এনালগ।
কালের কণ্ঠ : আপনার মতো সরকারও দাবি করছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের উন্নয়ন হয়েছে। অথচ গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবের কারণে শত শত কলকারখানা উৎপাদনে যেতে পারছে না।
গোলাম মওলা রনি : আমরা বিদ্যুতের উন্নয়ন বলতে আসলে বুঝিয়েছি বাতি জ্বলা। আগে যেখানে বিদ্যুৎ যেত ২০ বার, আমরা সেটাকে কমিয়ে এনে পাঁচবারে এনেছি। উন্নতি বলতে এটুকু। সফলতা হলো- বিএনপি সরকারের আমলে খাম্বা টানা হয়েছিল; কিন্তু বিদ্যুৎ দেওয়া হয়নি। এই সরকারের আমলে আমরা প্রায় ২৪ লাখ বিদ্যুতের কানেকশন দিয়েছি। এতে প্রায় এক কোটি লোক নতুন করে বিদ্যুতের আওতায় এসেছে।
আর গ্যাসের বিষয়টি ভিন্ন। গ্যাসের সমস্যার সমাধান হয়নি শাসক দলগুলোর সঙ্গে ও দেশি-বিদেশি চক্রান্তের কারণে। এই টোটাল সেক্টরটি চলে গেছে বিদেশিদের হাতে। বাপেক্স দুর্বল হয়েছে। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর তেল-গ্যাস উত্তোলনের জন্য আমরা একটি রিগ ক্রয় করেছি। আমরা কৈলাসটিলা, সুন্দলপুর, সূনেত্রতে গ্যাস পেয়েছি। বেশ কিছু জায়গা থেকে গ্যাস উত্তোলনও করেছি।
আমার নিজের একটা কম্পানি কিন্তু আর্থিক লোকসানির কারণে বিক্রি করে দিয়েছি। কারণ সময়মতো গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ পাইনি। যখন পেয়েছি তখন আমার আর্থিক ক্ষতি এত বেশি যে তা আর নতুন করে চালু করতে পারব না।
গ্যাস সংকটের কারণে সারকারখানাগুলো আট মাস বন্ধ থাকে। প্রয়োজনীয় গ্যাসের ৫০ শতাংশও সরবরাহও করা যায় না। গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকছে। এ অবস্থায় আমরা শত শত কোটি টাকা খরচ করে রাজশাহী পর্যন্ত গ্যাসের পাইপলাইন টেনে নিয়ে গেছি। এটা হলো পুরোটাই অপরিকল্পিত শাসনের চিত্র।
কালের কণ্ঠ : আপনার বলছেন আপনাদের সরকারের আমলে বাপেক্স শক্তিশালী হয়েছে আর বিগত সরকারগুলো বিদেশিদের কাছে গ্যাস সেক্টর তুলে দিয়েছে। কিন্তু সাড়া জাগানো বিকল্প গণমাধ্যম উইকিলিস সূত্রে জানা যাচ্ছে, ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেএফ মরিয়র্টিকে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী কথা দিয়েছেন যে সাগরে দুটি বিরোধীহীন ব্লক দেওয়া হবে। তাহলে কি আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার পেছনে এসব দেওয়া-নেওয়ার একটা সম্পর্ক আছে?
গোলাম মওলা রনি : বাপেক্সের যে সক্ষমতা তা স্থলভাগের। এর বাইরে তারা সাগরে কাজ করেনি। সেই কারিগরি জ্ঞান ও যন্ত্রপাতিও আমাদের নেই। দেখুন, বাংলাদেশে সব থেকে বেশি গ্যাস উত্তোলন করে শেভরন। এখন শেভরনের যে সক্ষমতা তা যদি অর্জন করতে হয় তাহলে বাপেক্সকে যদি সরকার সাপোর্ট দেয় তবু ১০ বছর লাগবে। সমুদ্রে কাজ করার জন্য আরো অনেক প্রস্তুতি দরকার। তবে সে ক্ষেত্রে জয়েন্টভেঞ্চার করা যেতে পারে। সমুদ্রের গ্যাস উত্তোলনের জন্য আমাদের বিদেশি কম্পানির সঙ্গে যেতেই হবে।
শুধু আমাদের মতো দেশ নয়, সৌদি আরব-ইরানের মতো দেশের তেল-গ্যাস সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর দখলে রয়েছে। বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো প্রেশার আছে কি না আমি জানি না। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত তাঁদের দেশের কোনো ব্যবসায়ীর ছোট কোনো স্বার্থ থাকলেও ছুটে আসবেন। এটা তাঁদের পলিসি। হয়তো এ কারণেই জ্বালানি উপদেষ্টার সঙ্গে তাঁরা দেখা করেছেন। জ্বালানি উপদেষ্টা তখন হয়তো বলেছেন, আমাদের দিক থেকে সর্বোচ্চ যা যা করার তা করব। এটা একটা কূটনৈতিক পরিভাষা। এটাই হয়তো উইকিলিস ফাঁস করেছে।
কালের কণ্ঠ : যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক যে প্রভাব, সেখানে কি তাদের সঙ্গে আমাদের এ ধরনের কূটনৈতিক সাদামাটা আশ্বাস দেওয়ার মতো পর্যায় আছে?
গোলাম মওলা রনি : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কেন থাকবে না! আমরা তাদের ভয় করছি এমনি এমনি। সাপের দংশনে যেসব মানুষ মারা যায় তাদের মধ্যে ৯৯ শতাংশ মারা যায় হার্ট অ্যাটাক করে। কারণ আমাদের দেশের ১ শতাংশ সাপে বিষ আছে। যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের দেশের মানুষের ভয়ের কোনো কারণ নেই। আমরা সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করি চীন থেকে, আমাদের সবচেয়ে বেশি সাহায্য দেয় জাপান আর আমরা ভয় পাই আমেরিকাকে!
কালের কণ্ঠ : আপনার ভাষ্য মতে বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা নিজ নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শতাধিক দেশ ভ্রমণ করেছেন। এই সরকারের আমলে বিদেশে বাংলাদেশের কি নতুন কোনো বাজার তৈরি হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
গোলাম মওলা রনি : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শতভাগ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে নয়। আমাদের একটি মিশনে অনেক কাজ রয়েছে, যার মধ্যে অনেক বিভাগ কাজ করে। ফলে কাজের সমন্বয় হয় না। আর আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একজন ডাক্তার। ডাক্তারি শিখে তিনি গেলেন যে আমি আর ডাক্তারি করব না, আমি এখন উকালতি করব। এখন তিনি রাজনীতি করতে এসে মন্ত্রী হয়ে গেলেন। মন্ত্রী হয়ে তিনি ১৩৭টি দেশ ভ্রমণ করলেন। যদি প্রতিটি ভ্রমণে পাঁচ দিন করে সময় লাগে, তাহলে কত দিন লাগে (৬৮৫ দিন)?
এখন বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে যদি দেশের অর্থনৈতিক বাজার খোঁজার জন্য নিয়োজিত করতে হয় তাহলে দরকার তো তথ্য-উপাত্ত ও গবেষণার। এখন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো সাহায্যকারী নেই, তাঁর প্রতিমন্ত্রী নেই। সে সময় তিনি পাননি। বাংলাদেশের শুধু মানবসম্পদই নয়, দেশের ব্যাটারি, ওষুধ, গার্মেন্ট পণ্য, চানাচুর, আমাদের সবজি- সব কিছু রপ্তানি করা যায়।
আমাদের দেশের পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ পর্যটন নামে আমাদের দূতাবাসগুলোতে আলাদা কোনো বিভাগ নেই। কিন্তু যদি আপনি সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনা করেন তাহলে আমাদের দূতাবাসগুলোতে কিন্তু সুযোগ-সুবিধার অভাব নেই। দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বিএনপির সময় ৯২ সালে এ ধরনের একটি পরিকল্পনা ছিল। এ জন্য সে সময় বিএনপি ঠিক করল তারা জাপানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করবে। এ জন্য বিএনপি মোর্শেদ খানকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত বানিয়ে দিলেন। মোর্শেদ খান অনেক কাজ করলেন। এরপর যখন বিএনপি আবার ক্ষমতায় এলো, মোর্শেদ খানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বানিয়ে দিলেন। জাপানের সঙ্গে কিন্তু সেই থেকে আমাদের সম্পর্ক ভালো।
বর্তমান সরকার চীন, ভারত, মালেশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করছে। কিন্তু এগুলোর তো ধারাবাহিকতা দরকার। যদি এর পরের সরকার তা না করে তাহলে কিন্তু হলো না।
কালের কণ্ঠ : সরকারের শেষ সময় নুতন মন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হলো। এর মধ্যে কয়েকজনকে ঘিরে বিতর্ক রয়েছে। আপনি এই নতুন মন্ত্রী নিয়োগের বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?
গোলাম মওলা রনি : মন্ত্রী নিয়োগের বিষয়টি আসলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিষয়। তাঁর মেধা, যোগ্যতা, তাঁর চিন্তা-চেতনার সঙ্গে মেলে- এসব ভেবেই তিনি নিয়োগ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আসলে আমাদের কারো কিছু বলার নেই। এখানে যদি কোনো সফলতা আসে, সেটাও প্রধানমন্ত্রীর কৃতিত্ব। আর যদি সমাালোচনা আসে, তাহলে সেটাও তাঁর।
যেহেতু সরকারের শেষ সময়, সরকার যে গতিতে আগাচ্ছিল, এই মন্ত্রিসভার পরিবর্তনের কারণে কোনো পরিবর্তন হবে বলে আমি মনে করি না।
কালের কণ্ঠ : এবার আসি বিশ্বব্যাংক ও পদ্মা সেতু প্রকল্পে। আপনি কি মনে করেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করবে? এ সরকারের সময়ে কি পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হবে?
গোলাম মওলা রনি : বিশ্বব্যাংক নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদে ভাষণে একবার বললেন, পদ্মা সেতু নিজেদের অর্থে করব। আবার বললেন, রেল সেতু বাদ দিয়ে পদ্মা সেতু করব। আমি এ কথাটির জন্য তাঁকে সালাম জানাই। আজ থেকে তিন বছর আগে এ বিষয়ে সংসদে যে মিটিং হয়েছিল, সেখানে বলেছিলাম, বিশ্বব্যাংক এই সরকারের আমলে টাকা দেবে না। পদ্মা সেতু তৈরি তো দূরের কথা, আপনারা একটা খুঁটিও গাড়তে পারবেন না এই সরকারের আমলে। পারলে নিজেদের অর্থায়নে করুন। প্রধানমন্ত্রীকে বোঝান। কারণ যেসব কাগজপত্র আদান-প্রদান হয়েছে, তা পড়ে এটা আমার মনে হয়েছে। সেখানে তৎকালীন সচিব ও যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনও ছিলেন।
এই পদ্মা সেতুটির সঙ্গে যদি রেল সেতু করেন তাহলে ব্যয় দাঁড়াবে ১২ হাজার কোটি টাকা। এই বারো হাজার কোটি থেকে ব্যয় বাড়তে বাড়তে এটা হয়েছে এখন ২৬ হাজার কোটি টাকা। পদ্মা সেতুর যে আট মাস দেরি হলো, তাতে আরো দুই হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে। আর যদি আপনি শুধু সড়ক সেতু করেন তাহলে আট থেকে দশ হাজার কোটি টাকায় হয়ে যাবে। আমরা ২০ হাজার কোটি বাড়তি খরচ করে রেল সেতু করছি; কিন্তু আগামী ২০ বছরেও কিন্তু রেল চালু করতে পারব না। কারণ রেল চালু করতে হলে রেললাইনের পেছনেসহ অন্যান্য খরচ হবে আরো ৬০ হাজার কোটি টাকা। যেখানে আমরা ২৫-৩০ হাজার কোটি টাকা জোগাড় করতে পারি না, কিভাবে ৬০ হাজার কোটি টাকা জোগাড় করব? ফলে এই রেল সেতুতে তখন আপনাকে বাচ্চাদের খেলনা চালাতে হবে। এটা পড়ে থাকবে।
বিশ্বব্যাংকের ফিরে আসা নিয়ে সরকার ভয়াবহ বিব্রত হবে। বিশ্বব্যাংক দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে বসবে। তারপর বড় বড় কর্তাদের মিডিয়ার সামনে এনে পর্যুদস্ত করবে। দেখবেন তখন সরকারের কাপড়চোপড়ও থাকবে না। তখন না পারবে গিলতে, না পারবে ঠেলতে। তখন যদি সরকার কোনোভাবে কিছু বলে, তাহলে বিশ্বব্যাংক বলবে, দুর্নীতি তদন্তে সহায়তা না করায় আমরা গেলাম।
বিশ্বব্যাংকের খপ্পরে যারা একবার পড়েছে, তাদের সব কিছু গেছে। হয় আপনাকে শেষ করে দেবে, নতুবা একদম কুকুরের মতো মাথা নত করে প্রভুর সামনে থাকবেন। আমরা ভিক্ষুকদের সঙ্গে যেমন আচরণ করি, বিশ্বব্যাংকও আমাদের সঙ্গে সে রকম আচরণ করে।
কোটি কোটি মাথাকে বিকিয়ে দিয়ে আমাদের পদ্মা সেতু দরকার কি না, তা ভাবতে হবে।
চুয়াত্তর সালে বিশ্বব্যাংক ও আমেরিকার কবলে পড়ে কিন্তু দুর্ভিক্ষ হয়েছিল বাংলাদেশে। আমরা আবার সেদিকে যাচ্ছি।
কালের কণ্ঠ : আপনাদের আমলে শেয়ার, ডেসটিনি, হলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা ঘটছে। আপনারা মূলত তরুণদের ভোটে ক্ষমতায় এসেছেন। এই তরুণদের জন্য আগামী নির্বাচনে কী বলবেন?
গোলাম মওলা রনি : শেয়ার মার্কেট, হলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো ঘটনায় সবাই হতবাক হয়েছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমরা তরুণদের ভোটের কারণে বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়েছি। এই কেলেঙ্কারির জন্য আমাদের সামাজিক যে অবিচার, এটা তারই বহিঃপ্রকাশ। তবে সরকার চেষ্টা করছে। হলমার্ক যে ঘটনাটি ঘটিয়েছে তা কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে। মিডিয়া এই দুর্নীতির বিষয়টি ফাঁস করে দিয়েছে। সরকারদলীয় যেসব লোকের নাম আসছে, সরকারের উচিত তাঁদের কোনো ছাড় না দেওয়া। জাতীয়ভাবে তরুণ ভোটারদের কী বলা হবে, সে বিষয়ে হয়তো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও নির্বাচন পরিচালনা বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু আমার এলাকার তরুণ ভোটাররা আমার পক্ষেই আছে। ভোট যার অধীনেই হোক না কেন, আমি সেখান থেকে আগের থেকে বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়ে আসব।
কালের কণ্ঠ : আপনার কি মনে হয়, সব দল নিয়ে একটি নির্বাচন হবে?
গোলাম মওলা রনি : নির্বাচন এ দেশে হবে। তবে কার অধীনে হবে সে সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো সময় এখনো আসেনি। এই মুহূর্তে রাজনীতিবিদদের বক্তব্য শুনে বলা যাবে না, রাজনীতি কোথায় যাচ্ছে। রাজনীতি কোথায় যাচ্ছে এর জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আগামী বছরের এপ্রিল পর্যন্ত।
কালের কণ্ঠ : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
গোলাম মওলা রনি : আপনাকে ও কালের কণ্ঠ পরিবারকেও ধন্যবাদ।কালের কণ্ঠ, রবিবার ৭ অক্টোবর ২০১২, ২২ আশ্বিন ১৪১৯, ২০ জিলকদ ১৪৩৩

শাওনের কান্না মিলি ভাবী এবং আমার প্রেম

অভিনেত্রী শাওন কাঁদছেন। সম্ভবত লেখক হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াত আত্দাও কাঁদছে। কাঁদছে বিশ্বব্যাপী হুমায়ূনের কোটি কোটি ভক্ত ও অনুরাগী। শাওনের মা তহুরা আলী আমার প্রিয় সহকর্মী। সংসদ সদস্য। তার বাবাও দেশের প্রথিতযশা ব্যবসায়ী। আমি তাদের চিনেছি অনেক পর। শাওনকে চিনেছি আগে। আশির দশকে নতুন কুঁড়ির মাধ্যমে। চিনতাম ঈশিতা এবং তারিনকেও। বাংলাদেশের কোটি কোটি টেলিভিশন দর্শকের কাছে অত্যন্ত প্রিয় নাম শাওন। ঈশিতা বিয়ে করে সুখী জীবনযাপন করছে। অনিয়মিতভাবে টেলিভিশন পর্দায় হাজির হলেও তার সুখী জীবন আমাদের আনন্দিত করে। তারিনের বিয়ে বিচ্ছেদের পর আমরা ব্যথিত হয়েছিলাম, পরবর্তীতে এ নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক না হওয়ায় আমরা উৎকণ্ঠিত হইনি। কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটল শাওনের জীবনে।

শাওন যখন হঠাৎ করেই লেখক হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন- সারা দেশে সমালোচনার ঝড় উঠল। চারদিকে ছি: ছি: রব উঠল। বলতে গেলে কোনো বাছ-বিচার না করেই। হুমায়ূন আহমেদ বাধ্য হয়েই একটি জাতীয় দৈনিকে আত্দপক্ষ সমর্থন করে কলাম লিখলেন; কিন্তু সমালোচনা থামল না। আমি এ বিষয় নিয়ে অনেকের সঙ্গে আলাপ করলাম। দেখলাম সবাই বিরূপ। আমি বিষয়টি ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার চেষ্টা করেছি। যদিও বয়সের দিক থেকে প্রেম ও প্রণয়টি অসম ছিল; কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তা অনৈতিক, বেআইনি বা অবৈধ ছিল না। বরং চিরন্তন প্রেমের দুর্বার আকর্ষণে মেধাবী শাওন কিভাবে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং হুমায়ূন আহমেদের মতো বিদ্বজ্জন-পণ্ডিত মানুষ সমাজ সংসারের মতো বাধা উপেক্ষা করে প্রেয়সীর হাত ধরে এগিয়ে গিয়েছিলেন- তা ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। আমার জানা মতে, হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তার মনোমালিন্য ছিল দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের শিল্প ও সাহিত্যাঙ্গনের অনেকেই তা জানত। জানত একথাও যে, তারা দুই বছর কার্যত আলাদা বসবাস করছিলেন। হুমায়ূনের মনের এই অন্তর্দহনের সন্ধিক্ষণে সম্ভবত শাওনের আগমন।

হুমায়ূন-শাওনের প্রেম ও বিয়ের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো- তারা ভণ্ডামি বা চুপি চুপি কোনো অবৈধ কাজ করেননি। অথচ আমাদের সমাজের প্রচলিত প্রথা হলো-বিখ্যাত মানুষেরা অহরহ কোনো কেলেঙ্কারি করে যাবেন আর সমাজ তা চেয়ে চেয়ে দেখবে। যে সময় হুমায়ূন-শাওনের প্রণয় সংঘটিত হয় ওই সময় হুমায়ূন একজন ডিভোর্সি নিঃসঙ্গ পুরুষ হিসেবে ছিলেন। প্রচলিত সমাজে এ বিয়ে নিয়ে কোনো কথাই হতো না, যদি না পাত্র-পাত্রী হুমায়ূন আহমেদ ও শাওনের মতো বিখ্যাত না হতেন।

টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে শাওন বলার চেষ্টা করেছেন তাদের দাম্পত্য জীবনের পারিপাশ্বর্িক বেদনা ও অন্তর্ঘাত সম্পর্ক। কিন্তু আমার বিশ্বাস, সারা জীবনের নাট্যাভিনয়ের মতো কুশলতা জানা সত্ত্বেও নিজের জীবননাট্যে তিনি অভিনয় করতে পারেননি। তিনি ছিলেন বাকরুদ্ধ এবং যা বলা উচিত ছিল তা আবেগের কারণে গুছিয়ে বলতে পারেননি। হুমায়ূন-শাওন প্রাণান্ত চেষ্টা করেছিলেন একটি সুখী গৃহকোণ গড়ে তোলার। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি তারা সেটি পারেননি। আমাদের সমাজ সেটি করতে দেয়নি। দু'পরিবারের নিকটজনের সমালোচনা, অসহযোগিতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে মানসিক নির্যাতন তাদেরকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল প্রতিনিয়ত। তারা যে ভালো নেই তা আমি বুঝেছিলাম তাদের জীবনযাত্রার ধরন দেখে। বিবাহ পরবর্তী সময়ে হুমায়ূন আহমেদের নাটক ও বিভিন্ন লেখায় সাবেকী টান বা চিরায়ত আকর্ষণ ছিল না। এরই মধ্যে শাওন অন্তঃসত্ত্বা হন এবং কিছুদিন পর তার গর্ভপাত ঘটে। পত্র-পত্রিকায় এ গর্ভপাতের বিষয়ে বিভিন্ন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। কিন্তু আমার মনে হয় শাওনের মনের অশান্তি ও গর্ভপাতের অন্যতম কারণ ছিল। যাই হোক, বছর দুয়েকের মধ্যে এই দম্পতি দৃশ্যত অনেক কিছু গুছিয়ে নিলেও সমাজ তাদেরকে ছাড়েনি।

মেহের আফরোজ শাওন তার বয়সের তারুণ্যের কারণে অনেক সামাজিক বাধা উপেক্ষা করতে পারতেন, কিন্তু হুমায়ূন হয়তো পারেননি। ফলে নিজের অজান্তে তিনি কাঁদতেন। কাঁদতেন প্রতিনিয়ত, বিশেষ করে আগের সংসারের ছেলেমেয়ে নুহাশ, শিলা ও নোভার কথা মনে করে। তারাও হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে খুবই নির্মম আচরণ করতেন। পত্রিকা মারফত জানতে পারলাম, শিলার বিয়ে এবং সেই বিয়েতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আমন্ত্রিত হওয়ার উপাখ্যান। বড়ই বেদনাদায়ক এবং মর্মস্পর্শী। এত বেদনা বহন করার বয়স হয়তো হুমায়ূন আহমেদের ছিল না। ফলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং তার শরীরে ক্যান্সার বাসা বাঁধে। আমার কেন জানি মনে হয়, আমরাই হুমায়ূন আহমেদকে মেরে ফেলেছি এবং তার বিধবা স্ত্রীকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছি।

এ লেখা যখন লিখছি তার কিছুক্ষণ আগে আমাকে মিলি ভাবী ফোন করেছিল আমার একটি লেখার বিষয়ে মন্তব্য জানানোর জন্য। মিলি ভাবী মানে মিলি রহমান। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের বিধবা স্ত্রী। এরপরই শাওনের সাক্ষাৎকারটির কথা মনে পড়ল। সাক্ষাৎকারের মূল কারণ মনে হচ্ছে, সমাজ সংসারের সমালোচনার জবাবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার প্রয়াস। চ্যানেল আইয়ের মালিক ফরিদুর রেজা সাগর প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের অত্যন্ত স্নেহধন্য ছিলেন। সম্ভবত সেই কৃতজ্ঞতায় তিনি চ্যানেল আইয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় টকশো অনুষ্ঠান তৃতীয় মাত্রায় শাওনের সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করেন। যা বলছিলাম, সাক্ষাৎকারে শাওন বার বার বলার চেষ্টা করেছেন তিনি হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী হিসেবেই সারাজীবন থাকতে চান। তার এই কথায় আমার মিলি ভাবীর কথা মনে হলো। মিলি রহমান যখন ১৯৭১ সালে বিধবা হন, তখন তো তার বয়স শাওনের চেয়েও কম ছিল এবং তার পারিবারিক এবং পারিপাশ্বর্িক অবস্থা ছিল আরও প্রতিকূলে। কাজেই সেই মিলি ভাবী যদি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্মৃতি নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে পারেন, তাহলে আমাদের শাওন কেন পারবেন না?

আরেকটি বিষয় মনে হলো যে, শাওনের চারপাশের পরিবেশ হয়তো তার ব্যক্তিগত চরিত্রে কিংবা ভবিষ্যৎ প্রণয়ের সম্ভাবনা নিয়ে বিরাম সমালোচনা করছে। হুমায়ূনের মৃত্যুর পর কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় এ নিয়ে বিভিন্ন কল্প- কাহিনীও প্রচার হয়েছে। এক মহাউৎসাহী হুমায়ূন ভক্ততো মামলাই করে ফেললেন। আমার বক্তব্য হলো- শাওনের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার নৈতিক অধিকার কেবল তার নিজের বা ক্ষেত্রবিশেষে পিতামাতার। অযথা সমালোচনা করে তাকে বিব্রত করছি কেন? সেই কবে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিং সতীদাহ প্রথা বন্ধ করেছেন পাক-ভারত উপমহাদেশ থেকে, অথচ প্রায় ২০০ বছর পর আমরা বিধবা শাওনের জন্য সেই প্রথা পুনরায় কার্যকর করতে যাচ্ছি। আমাদের ইচ্ছা- হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গেই শাওনের মরা উচিত ছিল। সেহেতু নিদেনপক্ষে তা হয়নি। কাজেই সারাজীবন সাদা বসনের ধবধবে শাড়ি পরেই শাওনকে সমাজে চলাফেরা করতে হবে।

বর্তমানে শাওনকে ঘিরে যেসব সমালোচনা হচ্ছে তার অন্যতম প্রধান উপকরণ হচ্ছে প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের বিষয়-সম্পত্তি। সবার সন্দেহ- শাওন সব বিষয়-আশয়, সম্পত্তি কুক্ষিগত করেছেন বা করার চেষ্টা করেছেন। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা উচিত যে- হুমায়ূন আহমেদ একজন অধ্যাপক কাম-লেখক ছিলেন। তিনি বিল গেটস, রকফেলার, স্টিভ জবস কিংবা ভারতের ধীরুভাই আম্বানীর মতো ব্যবসায়ী ছিলেন না। তার সহায়-সম্পত্তি বলতে হয়তো ঢাকাতে ২/১টি ফ্ল্যাট, গাজীপুরের অজপাড়াগাঁয়ে 'নুহাশ পল্লী' নামের একটি বাগানবাড়ি বা সেন্টমার্টিন দ্বীপে একখণ্ড জমির ওপর একটি টিনের ঘর। হুমায়ূনের জাদুকরি কলম ও বিভিন্ন নাটকের কারণে ওইগুলোকে অমূল্য সম্পদ মনে হলেও বাস্তব মূল্য কিন্তু বেশি নয়। বাংলাদেশের একজন সাধারণ ধনী ব্যক্তিরও এরচেয়ে বেশি সম্পদ আছে। আর শাওন তো কোনো সাধারণ পরিবারের সন্তান নন। হুমায়ূন আহমেদ হয়তো সারাজীবন সঞ্চয়ের মাধ্যমে তিল তিল করে যে বিষয়-সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন শাওন তার জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি সম্পদ পেয়েছেন। কাজেই হুমায়ূন আহমেদের অন্যান্য নিকটাত্দীয়ের কাছে তার সহায়-সম্পত্তি হয়তো প্রিয় হতে পারে; কিন্তু শাওনের কাছে হুমায়ূনের স্মৃতিই সবচেয়ে মূল্যবান। অন্য কোনো সম্পত্তি নয়। আমি এত দৃঢ়ভাবে শাওনের পক্ষে বলতে পারছি নিজের জীবনের একটি বিবাহ-পরবর্তী পরিণয়ের অভিজ্ঞতা থেকে। শাওন যেভাবে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন তা কোনো মামুলি ঘটনা ছিল না। বিস্ময়কর প্রেমের অবিস্মরণীয় দৃঢ়তা ও ইচ্ছাশক্তি এবং সর্বোপরি মোহময় আকর্ষণে একে অপরের প্রতি আস্থাশীল হয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কাজেই আমি তাকে শ্রদ্ধা করি। শ্রদ্ধা করি নিজের জীবনের একটি খণ্ডিত ঘটনার বিরূপ অভিজ্ঞতার জন্য। সেটিও ছিল বিবাহ-পরবর্তী প্রেম। যা এসেছিল আমার জীবনে সেই ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে। এক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণী হঠাৎ করেই আমার প্রেমে পড়ে। তরুণীর রূপ, লাবণ্য, শিক্ষা-দীক্ষা এবং বংশ মর্যাদা সব পুরুষের জন্যই একান্ত কাম্য। আমিও আকর্ষিত হলাম। সারা জীবনে কোথাও প্রতারণার আশ্রয় নেইনি। তাই পরিচয়ের প্রথম পর্বেই বললাম, আমি বিবাহিত এবং দু'সন্তানের জনক। খুব কষ্ট হচ্ছিল সত্যি কথা বলতে। কিন্তু বলেছিলাম এই আশায় যে, হয়তো তরুণীটি আমাকে পছন্দ করবে না। প্রথমে সে খুব কাঁদল এবং আমাকে গালাগালও দিল। আমি নির্বোধ ও নির্বাক হয়ে রইলাম। বললাম, আমার কী দোষ। গতকালই তোমার সঙ্গে দেখা হলো এবং বুঝতে পারলাম তুমি আমার প্রতি আকৃষ্ট। তাই সত্য কথা বললাম। এরপরও যদি এগুতে চাও আমি রাজি! কিন্তু সে রাজি হলো না। কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। ব্যথাভরা হৃদয়ে আমি আমার কর্মস্থলে ফিরলাম এবং মনে মনে তার নাম রাখলাম অনামিকা। কিন্তু তিন/চার দিন পর অনামিকা আমার অফিসে এলো এবং বলল, আমাকে ছাড়া নাকি তার চলবে না। আমার ব্যবসাও তখন ছোট। একটি বউ নিয়ে চলতে কষ্ট। দুই বউ বা সংসার কল্পনাও করতে পারি না। কিন্তু অনামিকার প্রবল আকর্ষণ আমাকেও বিভোর করে তুলল। মনে হচ্ছিল দেখি না কী হয়। সে নিয়মিত অফিসে আসত এবং দীর্ঘক্ষণ অফিসে বসে থাকত। আমার তখন আলাদা রুম ছিল না। সবার সামনে যেমন সে বসে থাকত আর আমিও তাকে বসিয়ে রেখে সব কাজ করতাম। সে আমাকে হুমকি দিত আমি যদি তাকে বিয়ে না করি তবে সে আত্দহত্যা করবে। আমি ভীষণ ভয় পেলাম। ভয় পেলে মানুষ বেকুবের মতো আচরণ করে, বোকা হয়ে যায়। আমার অবস্থাও তদ্রূপ হলো। আমি আমার স্ত্রীর কাছে সব খুলে বললাম। আর যায় কোথায়, শুরু হলো তুফান। সবকিছু ধ্বংস হয় হয় অবস্থা। এরই মধ্যে অনামিকা আমার অফিসে আসা বন্ধ করে দিল। তখন তো আর মোবাইল ছিল না। আমি ইডেন কলেজে দেখা করতে গেলাম। দেখা হলো না। কিন্তু একটি চিরকুট পেলাম। সে লিখেছে- 'এই কয়দিন তোমার সঙ্গে চলাফেরা করে তোমাকে জানার ও বোঝার চেষ্টা করেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তুমি অনেক বড় হবে, বিখ্যাত হবে এবং সম্পদশালী হবে। অন্যান্য সফল মানুষের মতো তুমিও তাড়াতাড়ি মরবে। আর তোমার মৃত্যুর পরই শুরু হবে আমার দুর্ভোগ। তোমার পরিবারের সবাই তোমার প্রথম স্ত্রীর পক্ষ নেবে এবং আমাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে। অন্যদিকে আমি আমার বাবা-মার পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন থাকব। ওই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না আমার। কাজেই তোমার আমার বিয়ের স্বপ্ন এখানেই শেষ। বিদায়।'

প্রকাশ : ২শে সেপ্টেম্বর ২০১২, বাংলাদেশ প্রতিদিন

স্রষ্টার সৌজন্যবোধ এবং সৃষ্টির নোংরামি

স্রষ্টা মানে আল্লাহ। হিন্দুরা বলেন ভগবান। খ্রিস্টানরা বলেন গড। পারসিক অগি্ন উপাসকরা বলত খোদা। এগুলো মূলত মৌলিক নাম। এর বাইরেও দেশে দেশে সখ্য গুণবাচক নাম রয়েছে। আলোচ্য লেখায় আমরা আল্লাহ শব্দটি ব্যবহার করব।

সব ধর্মের বিশ্বাসীরাই মনে করেন জগৎসমূহের সৃষ্টিকর্তা হলেন আল্লাহ। এ অনন্ত মহাবিশ্বের সব প্রাণী ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায় হোক আল্লাহর আওতার বাইরে যেতে পারে না। আল্লাহ তার সৃষ্টির মধ্যেই স্বকীয় সত্তায় উপস্থিত। চিন্তাশীলদের কাছেও তিনি সমুজ্জ্বল। তিনি তার সৃষ্টির মধ্যে কর্মকুশলতায়, সৌন্দর্য, সৌকর্য এবং সৌজন্যবোধের অপার মহিমায় এমনভাবে ভাস্বর হয়ে আছেন যা মানুষমাত্রই বুঝতে পারে এবং সে মতে তারা তাদের কর্মপদ্ধতি ঠিক করে নেয়। আল্লাহ তাদেরকেই বলেছেন দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকামী মানুষ।

আমাদের রাজনীতি, সমাজনীতি এবং পারিবারিক মূল্যবোধের জায়গাটি বার বার আঘাতপ্রাপ্ত হয় প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিবর্গের দ্বারা। যিনি ক্ষমতাশালী প্রধান ব্যক্তিতে পরিণত হন, তার প্রধান ও প্রথম দায়িত্বই হয় অপরাধ, অপমান ও লাঞ্ছিত করে আত্দতৃপ্তি লাভের অপপ্রয়াস চালানো। ফলে একজন বড় হতে থাকে এবং অন্যরা ছোট হতে থাকে। বড় হতে হতে তার আকাঙ্ক্ষা আকাশের মালিক হওয়ার স্বপ্ন পর্যন্ত পেঁৗছে। অন্যদিকে যিনি ছোট হন, তিনি ছোট হতে হতে পা লেহনকারী কুকুর না হয়ে ক্ষান্ত হন না। প্রথমে বাধ্য হয়ে হয়তো ছোট হন কিন্তু পরে ইচ্ছা করেই ছোট হন। নিজেকে বড় করার জন্য মানুষের সবচেয়ে জঘন্য হাতিয়ার হলো অত্যাচার। কখনো অত্যাচার করা হয় অস্ত্রের মাধ্যমে আবার কখনো করা হয় ঘুষের মাধ্যমে। আল্লাহপাক আমাদের জিহ্বা তৈরি করেছেন একখণ্ড নরম ও সাবলীল মাংস দিয়ে। কিন্তু আমরা এই নরম জিহ্বা দিয়ে প্রায়ই কুড়াল, কোদাল কিংবা তরবারির কাজ করে থাকি।

হিন্দুরা যে তেত্রিশ কোটি দেবতা বিশ্বাস করে থাকেন তাদের অন্যতম শ্রীকৃষ্ণ। মহাভারতে আমরা শ্রীকৃষ্ণের উপাখ্যান জেনেছি। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, মানুষ অত্যাচার করতে করতে এক সময় নিজেকে ভগবান ভাবতে শুরু করে। অন্যদিকে মানুষ অত্যাচারিত হতে হতে যখন আর কোনো আশ্রয় পায় না তখন অত্যাচারীদের ভগবান ভাবতে শুরু করে। পরিস্থিতি যখন এরূপ হয় তখনই অবতার হিসেবে আমি আবির্ভূত হই। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয়। এখানে আবির্ভাব অর্থটি রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ কখনো সশরীরে স্রষ্টার প্রতিনিধি আসেন আবার কখনো স্রষ্টার বিচার জমিনে আবির্ভূত হয়। ইংরেজিতে আমরা এ বিচারকে বলি Devine Justice। জমিনে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করে মন্দ শাসকরা। তারা তাদের অযোগ্য সঙ্গী-সাথীদের দ্বারা যুগপৎভাবে বহুমুখী অত্যাচারের মাধ্যমে জনজীবন অতিষ্ঠ করে তোলেন। মন্দ শাসকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তার অযোগ্য সঙ্গী-সাথী বা পাত্রমিত্র। আর এখানেই আল্লাহর শিক্ষা কিন্তু ভিন্ন। প্রকৃতিতে আল্লাহ তার সৃষ্টির মধ্যে এমন ইকো ব্যালেন্স করেছেন যে, সহজেই তার মাহাত্দ্য, সৌন্দর্যপ্রিয়তা এবং সৌজন্যতার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠে। উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

প্রকৃতির অন্যতম সৌন্দর্য হলো ফুল। সৌন্দর্যমণ্ডিত পুষ্পকাননে পুরুষ ফুল এবং স্ত্রী ফুলের মধ্যে পরাগায়ন ঘটানোর জন্য আল্লাহ প্রজাপতিকে নিয়োগ করেছেন। ফুলের ওপর যখন হাজার হাজার প্রজাতির প্রজাপতি সকাল-সন্ধ্যা উড়ে বেড়ায় সেই দৃশ্য চিত্রায়িত করে কেউ হলেন মহান চিত্রশিল্পী, চলচ্চিত্রকার কিংবা নিদেনপক্ষে ফটোগ্রাফার। কবিরা অনাদিকাল থেকে কবিতা লিখছেন। লেখকরা লিখছেন গল্প, উপন্যাসসহ হরেক রকম সাহিত্য। অন্যদিকে মানুষের মলমূত্র ধ্বংস করার জন্য আল্লাহপাক যেসব পোকা-মাকড় বা জীবাণু সৃষ্টি করেছেন সেগুলোর আকার-আকৃতি কল্পনা করুন তো! মলমূত্রের পোকা-মাকড় যদি ফুলের পরাগায়ন ঘটাত এবং প্রজাপতি যদি মানুষের মলমূত্র খেত- এ জঘন্য দৃশ্য দেখে কেউ কি আল্লাহর প্রশংসা করত? এবার একটু প্রাণীকুলের দিকে তাকাই। যেসব বন্যপ্রাণী হিংস নয় এবং দেখতে সুন্দর তাদের খাদ্যাভ্যাস, বসবাস করার পদ্ধতি কিন্তু অন্যদের থেকে আলাদা। যেমন হরিণ। কিন্তু যাদের আমরা ঘৃণা করি সেই শূকর কিংবা কুকুর কি কি খায়? তাদের খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা এবং ব্যবহারই তাদেরকে আমাদের কাছে ঘৃণিত করে তোলে।

এবার মানুষ প্রসঙ্গে আসি। মানুষ যখন তার মানবীয় গুণাবলীর পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে তখন জমিন থেকে আসমান পর্যন্ত তার প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে। জমিনের মানুষ প্রশংসা করে। আসমানে করেন ফেরেশতারা। তিনি যখন জমিনে হাঁটাচলা করেন তখন অপরাপর সৃষ্টি তার জন্য দোয়া করতে থাকে। অথচ এ একই মানুষই যখন মন্দ কাজ করতে করতে এমন পারঙ্গমতা অর্জন করে যে, ইবলিশ শয়তানও স্তব্ধ হয়ে ভাবতে থাকে 'ও' এ শয়তানি শিখল কি করে। মানুষের মধ্যে ইদানীং বিশ্বব্যাপী সমকামিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ সমকামিতা কি জিনিস তা শয়তানও জানে না। এমনকি শিয়াল, কুকুর, গরু-গাধাও সমকামিতা করে না। মানুষের দুটি খারাপ দিক নিয়েই সাধারণত বেশি আলোচনা হয়- একটি আচরণগত, অর্থাৎ ব্যবহারিক। সাধারণ বাংলায় বলে ওর ব্যবহার খারাপ বা চোপা খারাপ। অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে চোখ পাকিয়ে মানুষকে কষ্ট দেয়। অন্যটি হলো আজেবাজে এবং অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে মানুষকে কষ্ট দেয়। লোকে বলে- ওর চোপা খারাপ। অর্থাৎ মুখ খারাপ। কিন্তু মানুষের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো অশ্লীল চিন্তা বা চেতনা। বিশ্বের তাবৎ মাখলুকাত অর্থাৎ সৃষ্টিকূলের মধ্যে কেবলমাত্র মানুষই স্বাধীনভাবে ভালো-মন্দ চিন্তা করার অধিকারী। অবচেতন মনে মানুষ যেসব খারাপ চিন্তা করে তা-ই পরবর্তীতে সে কোনো না কোনোভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। এটা যে কত ভয়াবহ ও জঘন্য হতে পারে তার একটি উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে। এটি সাম্প্রতিককালের বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী কলঙ্কময় ঘটনাগুলোর একটি। ঘটেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে। একটি অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে কয়েকজন কোরীয় ও চীনা যুবক থাকেন। সামনের ফ্ল্যাটে থাকেন আরব দেশীয় একজোড়া দম্পতি। তাদের ছিল পাঁচ বছরের একটি অনিন্দ্যসুন্দরী কন্যাসন্তান। এ নাবালিকা কন্যাটি প্রতিদিন বিকালে অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সামনের পার্কটিতে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলা করত। কোরীয় ও চাইনিজ যুবকরা প্রায়ই বাচ্চাদের খেলা দেখত এবং এক পর্যায়ে ওই বাচ্চাটির প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হলো। বাচ্চাটির ছন্দময় গতি অসাধারণ সৌন্দর্য এবং সুন্দর স্বাস্থ্যের দিকে তারা বিশেষভাবে নজর দিল। নিজেরা বাচ্চাটিকে নিয়ে অনেক আলোচনা করল এবং মনে মনে ভাবল এই সুন্দর বাচ্চাটির মাংস খেতে না জানি কত মজা লাগবে। যে রকম চিন্তা সেই রকম কাজ। তারা সুযোগমতো বাচ্চাটিকে অপহরণ করল এবং ঠিকই জবাই করে তার মাংস রান্না করল এবং শেষমেশ খেলো। ওই যুবকদের একজনের হঠাৎ করেই পেট ব্যথা শুরু হলো এবং যথারীতি হাসপাতালে নেওয়া হলো। ডাক্তার প্রচলিত ওষুধ দিয়ে কিছুতেই ব্যথা উপশম করতে পারছিলেন না। অবশেষে বমি করানো হলো। ফলে পেটের ভেতর থেকে পরিপাক না হওয়া খাদ্যদ্রব্য বের হয়ে এলো, যার মধ্যে ছিল ওই শিশুটির মাংস। পরবর্তীতে ডাক্তাররা পরীক্ষার মাধ্যমে যখন জানতে পারলেন, মাংসের টুকরাগুলো মানুষের তখন পুলিশে খবর দিলেন এবং আসল সত্য এমনি করেই প্রকাশ হয়ে পড়ল বিশ্বব্যাপী।

মানুষের এই চিন্তা এবং আচরণগত ভিন্নতা নির্ণীত হয় এবং নিয়ন্ত্রিত হয় জিনের মাধ্যমে। জিন মানে এক ধরনের জীব কোষ, যা কিনা হাজার হাজার বছর ধরে মানব শরীরে বংশপরম্পরায় বাহিত হয়ে থাকে। এ জন্য বড় কোনো পদ বা পদবিতে ভালো বংশের লোক খোঁজা হয়। কারণ জেনেটিক থিওরি অনুযায়ী ভালো জিনের অধিকারী মানুষ খারাপ কাজ করতে পারে না। অন্যদিকে জিনগত ত্রুটি থাকলে মানুষ তার প্রভাবে খারাপ কাজটি এক সময় না একসময় করে ফেলবেই। অপরাধ বিজ্ঞানে (Criminology) একটি অধ্যায় রয়েছে By born Criminal- বাংলায় অর্থ দাঁড়ায় 'যাদের জন্মই হয় অপরাধ করার জন্য'। এই থিওরি মতে, অপরাধীরা তাদের শরীরে অপরাধ-সংক্রান্ত জিন বহন করার পাশাপাশি কিছু বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়ে থাকে। যেমন এদের মুখমণ্ডল, ঠোঁট, আঙ্গুলের আকৃতি, নখ, চোখ, চোখের ভ্রু, পায়ের গঠন ইত্যাদি অস্বাভাবিক হয়ে থাকে। এসব লোক কখনো কখনো পেশাদার অপরাধী হিসেবে কাজ করে আবার কখনো কখনো ভদ্র বেশে সমাজের অপরাপর মানুষের সঙ্গে সাধারণ বেশে মিলে-মিশে থাকে। কিন্তু সময় ও সুযোগ বুঝে সে তার অপরাধমূলক কাজটি ঠিকই করে বসে। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় এ প্রকৃতির মানুষ রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে বসলে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আফগানিস্তানে হঠাৎ করেই একজন পেশাদার ডাকাত রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে বসে। নাম তার দস্যু বাচ্চা ই সাক্কো। এমন অদ্ভুত ঘটনা ইতিহাসে খুব কমই ঘটে। এ ডাকাত যখন আফগানিস্তানের শাসক হলো তখন সারা দেশকে একটি পাগলা গারদ বানিয়ে ফেলল। সে লেখাপড়া জানত না। শহরের আধুনিক জীবনযাপন সম্পর্কেও তার কোনো ধারণা ছিল না। মূলত দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে পথের বাঁকে বাঁকে ওত পেতে থেকে সে ডাকাতি করত। এভাবেই সে হঠাৎ কাবুলে উপস্থিত হয়। সেখানে তখন চলছিল দারুণ বিশৃঙ্খলা। ডাকাত দল হাঁটতে হাঁটতে রাজপ্রাসাদের দিকে এগুতে থাকে এবং কেবলমাত্র ডাকাতির উদ্দেশ্যেই অনেকটা অরক্ষিত প্রাসাদে ঢুকে পড়ে এবং আরব্য উপন্যাসের আলী বাবার মতো সিংহাসনে গিয়ে বসে। কিন্তু সিংহাসনে বসেই সে লাফ দিয়ে সরে আসে। বসার স্থানটিকে আরামদায়ক করার জন্য স্প্রিং লাগানো ছিল। ফলে দস্যু সাক্কো যখন স্প্রিংয়ের গদিওয়ালা সিংহাসনে লাফ দিয়ে বসল তখন গদির ভেতরকার স্প্রিংগুলো তাকে সজোরে ঝাঁকি মারল। ওরে বাবারে বলে সে লাফ দিয়ে সিংহাসন থেকে সরে এলো। মনে করল সিংহাসনের মধ্যে ভূত রয়েছে। ডাকাত সর্দার সাক্কো এবার ভূত দেখার জন্য জিদ ধরল। রাজপ্রাসাদের কর্মচারীরা যতই অনুনয়-বিনয় করে তাকে গদির ভেতরকার স্প্রিংয়ের কথা বলল, ততই ভূত সম্পর্কে তার সন্দেহ বাড়ল। সে হুকুম করল সিংহাসনের গদি কেটে টুকরা টুকরা করে ভেতরের ভূত বের করে আনার জন্য। হুকুম তামিল হলো- ফোম, তুলা এবং স্প্রিং বের করে আনার পরও ডাকাত সর্দারের সন্দেহ দূর হলো না।

By born Criminal-এর রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের একটি ঘটনা ঘটেছিল ফ্রান্সে। এটিও অপরাধ বিজ্ঞানের পাঠ্য একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। যিনি রাজ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেন, তিনি বংশপরম্পরায় একজন পাকা এবং দাগি চোর ছিলেন। রাজা হওয়ার পরও তার চুরির অভ্যাস গেল না। তার কাছে আগত অন্য অঞ্চলের রাজা কিংবা রাজ কর্মচারীদের কিছু না কিছু তার চুরি করা চাই-ই। প্রাসাদের মধ্যে রাতের অাঁধারে ঘুরে বেড়াতেন চুরি করার জন্য। প্রাসাদরক্ষী কিংবা অন্দর মহলের দাসীবান্দীদের জিনিসপত্রও চুরি করতেন। যেহেতু রাজা স্বয়ং চুরি করছেন সেহেতু সবাই না দেখার ভান করত। রাজা মনে মনে নিজের চুরিবিদ্যা সম্পর্কে খুবই আস্থাশীল হয়ে পড়লেন। কারণ কেউ তার চুরি ধরতে পারেনি বলেই তার বিশ্বাস। এবার তিনি প্রাসাদের বাইরে চুরি আরম্ভ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। রাজার পাত্র-মিত্ররা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। তারা অনেক পরামর্শ করে একটি ক্ষতিপূরণ প্রদান কমিটি করল যার প্রধান দায়িত্ব হবে রাজা যেসব স্থানে চুরি করবেন সেসব স্থানে আগেই সতর্ক করে দেওয়া। ফলে তারা রাজার চুরির কর্মে কোনো বাধা প্রদান করবে না। বিনিময়ে ক্ষতিপূরণ কমিটি থেকে প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ পাবে। অন্যদিকে রাজা এসবের কিছুই জানল না। মনের আনন্দে রাজা চুরি করতে বের হতো হররোজ। বিশেষ করে বড় বড় বিপণিবিতানগুলো ছিল তার লক্ষ্যস্থল। ক্ষতিপূরণ কমিটির লোকজনও তাকে অনুসরণ করত ছায়ার মতো। একদিকে রাজা চুরি করতেন, অন্যদিকে ক্ষতিপূরণ কমিটির লোক চুরির স্থান, মাল ইত্যাদির তালিকা তৈরি করে যথাযথ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করত। সমসাময়িক রাজনীতিতে এটি কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা না হলেও অপরাধ বিজ্ঞানের একটি মজাদার অধ্যায় হিসেবে অপরাধ বিজ্ঞানীদের জ্ঞানের খোরাক জোগাচ্ছে। এবার আসি আল্লাহর সৌজন্যবোধ প্রসঙ্গে। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন আশরাফুল মাখলুকাত বা সেরা জীব হিসেবে। শারীরিক গঠন এবং চিন্তা-চেতনার উকৃষ্ট রূপের জন্যই মানুষ শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তার ইচ্ছামাফিক ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছেন। রাজনৈতিক ক্ষমতা, বংশ এবং বিত্ত-বৈভবের মাধ্যমে কাউকে কাউকে বিশেষভাবে মর্যাদাবান করেছেন। আল্লাহ একবার যাকে মর্যাদাবান করেন তাকে অমর্যাদাকর অবস্থায় ফেলেন না যতক্ষণ না পর্যন্ত ওই ব্যক্তি তার নিজস্ব কর্মযোগে নিজের পতন না ডেকে নিয়ে আসেন। আর এখানেই মানব চরিত্রের এক অদ্ভুত দিক উন্মোচিত হয়েছে সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে।

মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো কারও না কারও কাছে মাথানত করা। আরবিতে একে বলা হয় এজহারে তাজাল্লুল। এই মাথা যদি আল্লাহর কাছে নত হয় তাহলে বিশ্বভুবনে মানুষের তেমন কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু মাথাটি যদি আল্লাহর কোনো বান্দার কাছে নত হয় তখনই শুরু হয় বিপত্তি। যিনি নত করেন তিনি আর সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ থাকেন না। হয়ে যান মানুষরূপী অন্য কিছু। অন্যদিকে যার কাছে নত করা হয় তিনি এ আনুগত্য পেতে পেতে তার নফসের খপ্পরে পড়ে যান। যাকে বলা হয় নফসে আম্মারা। শয়তানের চেয়েও ভয়ঙ্কর এই নফসটি। ফলে ক্ষমতাবান লোকটি এক সময় নিজেকে মহাক্ষমতাধর ভাবতে থাকেন। পৃথিবীর অনেক শাসক এভাবেই নিজেকে একসময় প্রকাশ্যে আল্লাহ বলে ঘোষণা করেছিল। পরিণতি জঘন্যভাবে পতন। মানুষের মধ্যে যারা সাধারণত সুপার কোয়ালিটির হন তারাই কিন্তু এ বিপত্তিতে পড়েন। ইতিহাসের ফেরাউন, ফাতেমী সম্রাট আল মুইজ কিংবা ভারতের সম্রাট আকবর- তারা সবাই কিন্তু মানুষ এবং শাসক হিসেবে ছিলেন অতি উত্তম।

শাসকদের একমাত্র আরাধ্য থাকে- সবার কাছ থেকেই সীমাহীন আনুগত্য লাভের আকাঙ্ক্ষা। বিশেষ করে সর্বজন শ্রদ্ধেয়, জ্ঞানী এবং যোগ্য মানুষের আনুগত্য তাদের খুবই পছন্দ। কিন্তু জ্ঞানী ও সাধু লোকেরা আবার কারও আনুগত্য করতে চান না। ফলে পৃথিবীর রাজনীতির ইতিহাসে সৎ সজ্জন ও জ্ঞানী লোকদের সঙ্গে শাসকদের দ্বন্দ্ব-চিরায়ত একটি উপাখ্যান। ফলে শাসকদের দ্বারা অনেক পণ্ডিত ও সাধু ব্যক্তি নিগৃহীত বা ক্ষেত্রবিশেষে নিহত হয়েছেন। আবার
Devine Justice-এর পাল্লায় পড়ে অনেক শাসক হারিয়েছেন জীবন, রাজ্যপাটসহ সবকিছু। ইতিহাসের একটি সত্য ঘটনা বলে লেখাটি শেষ করব।

সময়টি ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। দিল্লী
তে তখন তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠাতা গিয়াস উদ্দিন তুঘলকের রাজত্ব। তার পুত্র মুহাম্মদ বিন তুঘলক ইতিহাসের পাগলা রাজা নামে সমধিক পরিচিত। ওই যুগে দিল্লীতে বাস করতেন বিখ্যাত দরবেশ নিজাম উদ্দিন আউলিয়া, পুরনো দিল্লীর মেহরুলিতে তিনি বহু বছর ধরে বাস করছিলেন সেই সম্রাট গিয়াস উদ্দিন বলবনের আমল থেকে। সুলতান বলবন থেকে সুলতান গিয়াস উদ্দিন তুঘলক পর্যন্ত কত সম্রাট এলো আর গেল সেই হিসাব নিজাম উদ্দিন আউলিয়া রাখতেন না। সব শাসকের একমাত্র আরাধ্য ছিল নিজাম উদ্দিন আউলিয়াকে দরবারে এনে আনুগত্য দাবি করা। কিন্তু দরবেশ কোনো শাসকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দরবারে যেতেন না। আবার শাসকরাও তাকে বিরক্ত করার সাহস দেখাতেন না। এভাবেই চলছিল। কিন্তু সম্রাট গিয়াস উদ্দিন তুঘলক সিংহাসনে বসেই ঘটালেন ব্যতিক্রমী ঘটনা। তিনি দরবেশকে সমন দিলেন দরবারে উপস্থিত হয়ে আনুগত্য প্রকাশের জন্য। দরবেশ এলেন না। সম্রাট সিদ্ধান্ত নিলেন হাতকড়া পরিয়ে দরবেশকে গ্রেফতার করে টানতে টানতে দিলি্লর দরবারে নিয়ে আসবেন। এর মধ্যেই হঠাৎ করে খবর এলো দোয়ার অঞ্চলের কৃষকরা বিদ্রোহ করেছে। সম্রাট সসৈন্যে বিদ্রোহ দমনে বেরিয়ে পড়লেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তিনি সফলতার সঙ্গে বিদ্রোহ দমন করে দিলি্ল অভিমুখে রওনা করলেন এবং রাজধানীর ২০ মাইল দূরবর্তী একটি এলাকায় তাঁবু গাড়লেন। সম্রাট এবার দিলি্লর কোতোয়াল অর্থাৎ পুলিশপ্রধানকে নির্দেশ পাঠালেন নিজাম উদ্দিন আউলিয়াকে গ্রেফতার করে পরের দিন রাজদরবারে হাজির করার জন্য। সম্রাটের উদ্ধত অহংকার দোয়ারের যুদ্ধজয়ের কাল বহু গুণে বৃদ্ধি পেল এবং এই উচ্ছ্বাস তিনি উপভোগ করতে চাইলেন দরবেশকে অপমানিত ও নির্যাতন করার মাধ্যমে।

সম্রাটের আদেশ পেয়ে দিলি্লর পুলিশপ্রধান শুরু করলেন কান্না। কারণ তিনি ছিলেন দরবেশের ভক্ত। কাঁদতে কাঁদতে তিনি দরবেশের দরবারে সম্রাটের ফরমান নিয়ে উপস্থিত হলেন। দরবেশ সব শুনলেন এবং নির্লিপ্ত রইলেন, কোনো জবাব দিলেন না। উৎকণ্ঠিত পুলিশপ্রধান আরজ করলেন হুজুর, সম্রাট দিল্লী
থেকে মাত্র ২০ মাইল দূরে অবস্থান করছেন। কাল সকালের মধ্যেই রাজধানীতে এসে পেঁৗছবেন! এখন আমি কি করব। হুজুর উত্তর করলেন- চিন্তা কর না বেটা। বাড়ি যাও নিশ্চিন্তে ঘুমাও, দিল্লী বহুৎ দূর হ্যায়

পরবর্তী ইতিহাস সবারই জানা। সম্রাট খুব ভোরে দিল্লী
র উদ্দেশে রওনা দিলেন। সম্রাটের পুত্র জুনা খান ওরফে মুহাম্মদ বিন তুঘলক তার যুদ্ধজয়ী পিতাকে বিপুলভাবে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য রাজধানীর উপকণ্ঠে বিশাল ও বর্ণিল তোরণ নির্মাণ করে হাজার হাজার দিলি্লবাসী নাগরিক, সৈন্য সামন্ত ও উজির-নাজিরদের নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। সম্রাট এলেন। যেই মুহূর্তে তিনি সেই বিশাল তোরণ অতিক্রম করছিলেন সেই মুহূর্তেই তা সম্রাটের মাথার ওপর ভেঙে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গেই সম্রাটের মৃত্যু হলো। দিল্লী তার কাছ থেকে দূরেই থেকে গেল।

লেখক : গোলাম মাওলা রনি, এমপি
প্রকাশ : ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০১২, বাংলাদেশ প্রতিদিন

তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে

প্রবাদটি মহাভারতের। হিন্দুদের অবতার শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব এবং বেড়ে ওঠা সম্পর্কে তৎকালীন জ্যোতিষেরা রাজা কংসকে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন- সেটারই অপভ্রংশ বাংলা ভাষায় দাঁড়িয়েছে 'তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে।' সে অনেক পুরনো কথা- কম করে হলেও পাঁচ হাজার বছর তো হবেই। শ্রীকৃষ্ণ সে সময় ভারতবর্ষে ছিলেন, ঠিক একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ছিলেন মুসলমান জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আঃ)। 

আলোচ্য প্রবাদটির অন্তর্নিহিত অর্থ হল- মানুষ তার নিয়তির অমোঘ পরিণতি থেকে কোনভাবেই রক্ষা পায় না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ মানুষকে লক্ষ্য করে বলেছেন, 'জীবনের সমস্ত দুর্ভোগ তোমাদের দু'হাতের কামাই।' কোরআনের অমিয় বাণী, অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের নীতিকথা এবং হাজার হাজার বছরের মানবজাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একথা স্পষ্ট যে, মানুষের কর্মই তার পরিণতি ডেকে নিয়ে আসে এবং একবার পরিণতি যদি ডাক দেয় তাহলে আর ফেরার পথ থাকে না। ইতিহাসের কয়েকটি নির্মম পরিণতির বিবরণ দিয়ে সাম্প্রতিক বাংলাদেশে ফিরে এলেই পাঠকরা বুঝতে পারবেন নিয়তি কিভাবে মানুষকে ডাকে। 


রাজা কংস তার রাজজ্যোতিষীর মাধ্যমে জানতে পারেন যে, তার নববিবাহিত বোন দেবকী এবং তার স্বামী বাসুদেবের ঔরসজাত সন্তানই হবেন তার হত্যাকারী এবং সিংহাসন দখলকারী। কংস এই ঘটনা জানার সঙ্গে সঙ্গে দেবকী ও বাসুদেবকে কারারুদ্ধ করেন। কিন্তু কারারক্ষীরা দয়াপরবশ হয়ে মাঝে মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর মিলনের ব্যবস্থা করে দিত। ফলে দেবকী গর্ভবতী হয়ে পড়েন এবং কারাগারেই কংসের অজান্তে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম দেন। ভীতসন্ত্রস্ত কারারক্ষীরা শিশু শ্রীকৃষ্ণকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় এবং পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে সুদূর গ্রামাঞ্চলের জনৈক গোয়ালের ঘরে রেখে আসে লালন-পালনের জন্য। এভাবে শ্রীকৃষ্ণ যখন গোয়াল-গোয়ালিনীর ঘরে বেড়ে উঠেছিলেন, তখন রাজা কংস তাচ্ছিল্যভরে রাজজ্যোতিষীকে জিজ্ঞাসা করলেন- কি হে তোমার ভবিষ্যদ্বাণীর কি হল। উত্তরে রাজজ্যোতিষী বললেন, 'তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে'- পরবতর্ী ঘটনা কমবেশি সবারই জানা, রাজা কংসের সীমাহীন অত্যাচার, অবিচার, হত্যা, নির্যাতন রাজ্যময় মানুষকে বিক্ষুব্ধ ও বিদ্রোহী করে তোলে। এই বিদ্রোহীরাই যুবক শ্রীকৃষ্ণকে তাদের নেতা মনোনীত করে এবং তার নেতৃত্বে কংসকে নিহত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। এখন পর্যন্ত কোন নিষ্ঠুর আত্দীয়কে ব্যঙ্গ করার জন্য আমরা কংস মামা শব্দটি ব্যবহার করি। 


নিয়তির আরও একটি নির্মম পরিহাসের ঘটনা ঘটেছিল খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৪০০ বছর আগে। অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। আজকের ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ভুটানের কাছে যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হয় এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যদি শৃংখলাবদ্ধ অবস্থায় ভুটানের রাজার কাছে নীত হন তাহলে বিশ্ববাসী যেরূপ হতভম্ব হবে, ঠিক তদ্রূপ হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল তাবৎ বিশ্ব, যেদিন লিডিয়ার রাজা ক্রিসাস মিডিয়ার রাজা সাইরাসের কাছে পরাজিত এবং বন্দি হয়েছিলেন। ভূমধ্যসাগরের দুই তীরের দুই রাজা। ইউরোপের অংশের নাম লিডিয়া। রাজার নাম ক্রিসাস। আজকের গ্রিসসহ প্রায় সব ইউরোপীয় রাজ্য ছিল লিডিয়ার অধীন বা করদরাজ্য কিংবা প্রভাবযুক্ত। প্রায় ২০০ বছর ধরে রাজা ক্রিসাসের বংশ একাদিক্রমে এই বিরাট সাম্রাজ্য শাসন করছিলেন এবং ক্রিসাস ছিলেন এই রাজপরিবারের সর্বোৎকৃষ্ট, যোগ্য এবং মহান শাসক। অন্যদিকে মিডিয়া ছিল এশিয়ায়। আজকের ইরান বা পারস্যের পার্সি পলিসে ছিল এর রাজধানী যা দীর্ঘদিন লিডিয়ার করদরাজ্য ছিল। সাইরাসই প্রথম কর দেয়া বন্ধ করে দেন এবং সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে আশপাশের ক্ষুদ্র রাষ্ট্র দখল করে রাজ্যের পরিধি বাড়ান। 


মিডিয়ার রাজা সাইরাসের তৎপরতায় সম্রাট ক্রিসাস খুবই বিরক্ত হলেন এবং যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। পৃথিবীকে হতবাক করে দিয়ে স্বল্পকালীন যুদ্ধে ক্রিসাস পরাজিত, বন্দি এবং মৃতু্যদণ্ডে দণ্ডিত হলেন। হুকুম হল শিকলবদ্ধ অবস্থায় জ্বলন্ত চিতায় ক্রিসাসকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হবে। সে মতে ক্রিসাসকে চিতার দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, দূর থেকে বিজয়ী রাজা সাইরাস দেখলেন যে, রাজা ক্রিসাস কি যেন আপন মনে বিড়বিড় করে বলছেন। সাইরাস খুবই আশ্চর্য হলেন। কারণ তৎকালীন বিশ্বের রেওয়াজ অনুযায়ী মৃতু্যদণ্ডপ্রাপ্ত সাহসীরা বিজয়ী রাজাকে গালাগাল দিতেন। অন্যদিকে ভীরু বা কাপুরুষরা প্রাণভয়ে হাউমাউ করে কাঁদতেন এবং প্রাণভিক্ষা চাইতেন। এর কোনটা না করে সম্রাট ক্রিসাস যখন আপন মনে বিড়বিড় করছিলেন তখন রাজা সাইরাস জানতে চান যে, বিড়বিড় করে আসলে কী বলা হচ্ছে। ক্রিসাস উত্তর করলেন- আমি তেমন কিছু বলছি না। কেবল আমার শাসনকালীন শেষ সময়ের একটি স্মৃতি স্মরণ করে বলছি- এই কি নিয়তি! এই কি ভাগ্য! রাজা সাইরাস যখন ক্রিসাসের সেই স্মৃতি জানতে চান তখন নিম্নের চমৎকার ঘটনাটি প্রকাশিত হয় যা ইতিহাসের জনক হিরোডোটাস তার হিস্টিরিয়া গ্রন্থে আরও চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন। 


ক্রিসাস বলেন- ঘটনাটি এই যুদ্ধযাত্রার কিছুদিন আগের যখন আমি এবং আমার রাজ্য সফলতার স্বর্ণশিখরে অবস্থান করছি। ২০০ বছরের পারিবারিক ঐতিহ্য, সঞ্চিত ধনরাশি, রাজ্যময় সুখ-শান্তি ও শৃঙ্খলা সর্বোপরি আমার সুস্বাস্থ্য, জ্ঞানগরিমা, প্রজাদের মধ্যে জনপ্রিয়তা এবং পারিবারিক শান্তি নিয়ে আমি ছিলাম আত্দতৃপ্তিতে মগ্ন এবং একই সঙ্গে গর্বিত এবং আহ্লাদিত। এমন সময় আমার জনৈক মন্ত্রী আমাকে খবর দিলেন যে, বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী এবং পর্যটক রাজধানীতে অবস্থান করছেন। আমি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ দিতে আগ্রহী কিনা। আমি সানন্দে রাজি হলাম এবং ওই মহান জ্ঞানী পর্যটককে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানালাম। খাবার টেবিলে বসার আগে আমার হুকুম মতো আমার লোকেরা জ্ঞানী মেহমানের কাছে আমার পরিবারের ২০০ বছরের বর্ণাঢ্য গৌরবগাথা বর্ণনা করল। ঘোড়াশালে এবং হাতিশালে নিয়ে পৃথিবীর সুন্দরতম এবং শক্তিশালী হাতি-ঘোড়া দেখাল। রাজকোষ উন্মুক্ত করে ২০০ বছরের সঞ্চিত বিপুল ধনরাশি দেখানো হল। অন্তঃপুরে নিয়ে আমার স্ত্রী এবং হাজার হাজার দাসদাসীকে দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে রাজপ্রাসাদের আরও অন্যান্য ঐতিহ্য ও জৌলুসতা দেখানোর পর খাবার টেবিলে আনা হল। শত পদের আয়োজন এবং সব রকমের জাঁকজমকপূর্ণ আড়ম্বর পরিবেশে উত্তম পোশাক পরিধান করে আমি তাকে অভ্যর্থনা জানালাম। অতীতের মেহমানদের মতো আমি তাকে আবেগাপ্লুত কিংবা আমার ব্যাপারে কৌতূহলী দেখলাম না। অনেকটা নির্লিপ্তভাবে তিনি আমার অভ্যর্থনা গ্রহণ করে খেতে বসলেন। আমি বেশ আশাহত ও বিমর্ষ হলাম। এক পর্যায়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম- মহাত্মন
, আপনি তো সারা পৃথিবী ভ্রমণ করেছেন! আপনার দেখা কিংবা জানামতে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটি কে? আশা ছিল তিনি আমার নামটি বলবেন, কিন্তু না, তিনি একজন অখ্যাত ব্যক্তির নাম বললেন। আমি দ্বিতীয় সুখী মানুষের এবং পরে তৃতীয় সুখী মানুষের নাম জিজ্ঞাসা করলে এবারও তিনি অখ্যাত দুই ব্যক্তির নাম বললেন। আমি ধৈর্য হারিয়ে রাগতস্বরে বললাম- আপনি তো দেখছি খুবই হিংসাপরায়ণ ও বাজে প্রকৃতির মানুষ! আমার ২০০ বছরের রাজপরিবারের সফলতার ইতিহাস, আমার নিজের সাফল্যজনক ১৭ বছর রাজত্বের ইতিহাস, অঢেল ধনসম্পদ, সুন্দর স্বাস্থ্য, সুন্দরী স্ত্রী, যোগ্য সন্তান-সন্ততি, শক্তিশালী রাষ্ট্র কাঠামো এবং সর্বোপরি সুখী প্রজাদের দেখে আপনার কি মনে হচ্ছে আমি খুবই অসুখী মানুষ? জ্ঞানী ব্যক্তির কোন ভাবান্তর হল না। তিনি উত্তর করলেন- 'হুজুর! রাগ করবেন না। আমি যে ৩ ব্যক্তির নাম বলেছি তারা সবাই মৃত। কোন জীবিত ব্যক্তিকে কখনও সুখী কিংবা দুঃখী বলা যায় না কারণ জীবনসায়াহ্নের যে কোন একটি ঘটনা ব্যক্তির সারা জীবনের সফলতাকে ম্লান করে তাকে একজন দুঃখী ব্যক্তিতে পরিণত করতে পারে। আবার সারা জীবনের দুঃখের পর শেষ জীবনের একটি সফলতা তাকে সবচেয়ে সুখী মানুষে পরিণত করতে পারে। পণ্ডিত ব্যক্তির উত্তর শুনে আমি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলাম এবং বললাম- আপনি তো দেখছি খুবই পাঁজি প্রকৃতির হিংসাপরায়ণ লোক! আমি এত আদর, এত সম্মান দেখিয়ে আপনাকে ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানালাম আর আপনি কিনা কামনা করছেন জীবনের শেষ প্রান্তে একটি দুর্ঘটনা আমার সব সফলতা ধ্বংস করে আমাকে একজন দুঃখী মানুষে পরিণত করে ফেলবে! আমি জ্ঞানী পর্যটককে দূর দূর করে প্রাসাদ থেকে তাড়িয়ে দিলাম এবং রাজ্য থেকে বহিষ্কার করলাম। আজ এই জ্বলন্ত চিতার সামনে দাঁড়িয়ে আমার কেবল সেই মহান পণ্ডিতের উক্তিই মনে পড়ছে! 

বিজয়ী রাজা সাইরাসও ছিলেন মহাজ্ঞানী এবং ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহানায়ক। সম্রাট ক্রিসাসের আত্দোপলব্ধি তাকে ভীষণভাবে আলোড়িত করল। তিনি অনুমান করলেন নিশ্চয়ই সম্রাট ক্রিসাস অত্যন্ত উঁচুমানের মানুষ এবং এই পৃথিবীর জন্য এ ধরনের মানুষ খুবই দরকার। তিনি ক্রিসাসের মৃতু্যদণ্ড মওকুফ করে তাকে তার প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করলেন। 


উপরোক্ত দুটি ঐতিহাসিক উপাখ্যানের বিস্তারিত বিবরণ, ব্যাখ্যা এবং তাৎপর্য বর্ণনা করতে গেলে হাজার পৃষ্ঠায়ও শেষ করা যাবে না। দুটি ঘটনাই আংশিক বা খণ্ডিতরূপে বর্ণিত হয়েছে। পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন এ উপাখ্যানের মাধ্যমে বাংলাদেশের বর্তমান মানুষদের আমি মূলত কী বুঝাতে চাচ্ছি? সরল বাংলায় বলতে গেলে আমি বলব মূলত নিয়তি বা পরিণাম কিভাবে মানুষের জীবনে আসে তার দুটি ভিন্ন আঙ্গিক প্রকাশ পেয়েছে ঘটনা দুটিতে। প্রথমটিতে কংস নিজের অত্যাচার, অবিচার ও অনাচার দ্বারা তার নিয়তিকে ডেকে এনেছেন। অন্যদিকে সম্রাট ক্রিসাস সব দিক থেকে যোগ্য বিবেচিত হওয়া সত্ত্বেও অনাহূত ও অপ্রয়োজনীয় হিংসার বশবতর্ী হয়ে তার পতন ডেকে নিয়ে এসেছিলেন। তৎকালীন প্রেক্ষাপটে লিডিয়া সম্রাটের কোন প্রয়োজনই ছিল না সাগরের ওপারের ক্ষুদ্র রাজ্য মিডিয়া আক্রমণের। গল্পের অন্য একটি প্রতিপাদ্য বিষয় হল প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যক্তি নিজের পতন নিজেই ডেকে নিয়ে আসে। অর্থাৎ ব্যক্তি নিজ কিংবা তার পারিপাশ্বর্িক পাত্রমিত্ররাই পতনের মূল নায়ক। বাইরের লোক বা পক্ষ এক্ষেত্রে কেবল সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে। 


সত্তরের দশক থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপট আলোচনা করলে দেখা যাবে যে, সরকারগুলোর পতন তার নিজেদের লোকদের দ্বারাই হয়েছে। যেমন ধরা যাক এরশাদ সরকারের পতনের কথা। এরশাদ যেদিন পদত্যাগ করলেন তার একদিন আগেও আমরা কেউ জানতে পারিনি আগামীকাল কী হতে চলেছে। এরশাদের নিয়োগকৃত সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল নূরউদ্দিন খান মূলত জামায়াত লবির বিএনপিঘেঁষা লোক ছিলেন। শেষ মুহূর্তে তিনি এরশাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করলে ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। এরশাদের পতনের পর তিনি প্রাণান্ত চেষ্টা করেছিলেন বিএনপির মনোনয়ন নেয়ার জন্য। কিন্তু নরসিংদীর যে আসনে তিনি মনোনয়ন চাচ্ছিলেন সেখানে সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের মতো শক্তিশালী প্রাথর্ী থাকায় তিনি সুবিধা করতে পারেননি। পরে দেখা গেল জেনারেল খান আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেলেন এবং মন্ত্রীও হলেন। 


এরশাদের আগে বিচারপতি সাত্তার সরকারের পতন ছিল নানা নাটকীয়তায় পূর্ণ বিশ্বাসঘাতকতার রাজনীতির এক কলংকময় অধ্যায়। সাত্তার মন্ত্রিসভার প্রায় সব সদস্য গোপনে এরশাদের সঙ্গে অাঁতাত করে দৃশ্যত বৃদ্ধ বিচারপতিকে নিঃসঙ্গ বানিয়ে ফেলেন। আওয়ামী লীগ বা অন্য কোন বাইরের শক্তি সেদিন বিএনপির পতন ঘটায়নি। বিএনপিই বিএনপির পতন ঘটিয়েছিল। কেন এরূপ হয়েছিল তা বর্ণনা করতে আবার অন্য প্রসঙ্গে যেতে হবে। এবার প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে আসি। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর এবং অন্যান্য অফিসারকে প্রত্যক্ষভাবে এই ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়েছে। জেনারেল মঞ্জুর রাষ্ট্রপতি জিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সহযোদ্ধা এবং সহযোগী ছিলেন। জেনারেল জিয়া সেদিন চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন মূলত চট্টগ্রাম বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্ব মেটানোর জন্য। রাতে ক্যান্টনমেন্টের বৈঠকটি জিয়ার সফরের কর্মসূচিতে পূর্বনির্ধারিত ছিল না। তার সফরসঙ্গীদের অনেককে তার হত্যাকাণ্ডের জন্য সন্দেহ করা হয়। এমনকি পারিবারিক লোকজনও সন্দেহের ঊধের্্ব নন। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, বিএনপি একাধিকবার ক্ষমতায় আসার পরও জিয়া হত্যাকাণ্ডের বিচার তো দূরের কথা- এ নিয়ে টুঁ শব্দটি উচ্চারণ করেনি। আমি মনে করি জিয়া হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার হলে বিএনপি নামক দলটি অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। 


এবার খন্দকার মোশতাকের পতন প্রসঙ্গে আসি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে খন্দকার মোশতাকের ঘনিষ্ঠতা ৪০-এর দশক থেকে। কিন্তু ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হলে দলের প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন বঙ্গবন্ধু এবং দ্বিতীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন খন্দকার মোশতাক। ব্যক্তিগত জীবনে মোশতাক ছিলেন অতিশয় দাম্ভিক, অহংকারী এবং উচ্চাভিলাষী। তিনি পীর বংশের লোক এবং কর্মজীবনে প্রথিতযশা আইনজীবী হওয়ার কারণে নিজেকে বঙ্গবন্ধুর চেয়ে অধিকতর যোগ্য মনে করতেন। কিন্তু গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদর্ীর আপাত্য স্নেহ এবং দলের তরুণ নেতাকমর্ীদের কাছে প্রবল জনপ্রিয়তার কারণে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অবস্থান ছিল খন্দকার মোশতাকের তুলনায় অনেক অনেক দৃঢ়। যা হোক সেই ১৯৫৩ সাল থেকেই মোশতাক বঙ্গবন্ধুর পেছনে লেগে ছিলেন। সর্বদা প্রিয় বন্ধুর ছদ্মাবরণে নিজেকে ঢেকে রাখলেও বঙ্গবন্ধুর পতনের জন্য কাজ করে যাচ্ছিলেন অনবরত। একথা এখন সবাই জানে যে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি অংশ, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ, ভারতের দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং তাদের প্রভাবাধীন রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা 'র'-এর একটি অংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে ছিল। চক্রান্তে জড়িত ছিলেন তৎকালীন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত সমর সেনও। খন্দকার মোশতাক যখন মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য আওয়ামী লীগ নেতাদের আমন্ত্রণ জানালেন সেদিন হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া সবাই হুড়হুড়িয়ে বঙ্গভবনে হাজির হয়েছিলেন। যাহোক মোশতাকের প্রেরণাদাতারা কয়েক দিনের মধ্যেই বুঝতে পারলেন যে, তারা একটি জঘন্যতম কাপুরুষ এবং অপদার্থকে প্রমোট করেছেন। তিনি যখন ক্ষমতার শীর্ষে সেই অবস্থাতেও বঙ্গভবনে একাধিকবার ক্যাপ্টেন ও মেজর পদমর্যাদার সামরিক অফিসারদের পা জড়িয়ে ধরে প্রাণভিক্ষা চেয়েছেন। কর্নেল ফারুক, রশিদ, ডালিম গংকে তিনি আজরাইলের মতো ভয় পেতেন। এরই মধ্যে ঘটে গেল মর্মান্তিক জেলহত্যা এবং তৎপরবতর্ী ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতা বিপ্লব। খন্দকার মোশতাকের এদেশীয় গোপন সহযোগীরা আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না। তাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হল। পরে জেনারেল ওসমানীর মধ্যস্থতায় প্রাণে বেঁচে যান মোশতাক কিন্তু ক্ষমতাচু্যত হন তারই দীর্ঘদিনের চক্রান্তের অংশীদারদের জন্য। 


১৫ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে এই পরিসরে আলোচনা অসম্ভব। বঙ্গবন্ধু যাদের বিশ্বাস করতেন এবং যাদের পরামর্শ মতো চলতেন সেই মোশতাক, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর গংই তাকে হত্যা করেছে। এখানেও ইতিহাসের সেই বাণী- তোমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে, কিংবা ঘরের শত্রু বিভীষণ। 


আমি নিজে নিজে ভাবি কেন অমন হয়! এর অন্যতম কারণ হল ক্ষমতায় যাওয়ার পর মানুষ সীমাহীন আনুগত্য পছন্দ করতে থাকে। অন্যদিকে সুবিধাবাদীরা কর্তার ইচ্ছায় এমনভাবে নিজেদের ক্ষমতার সামনে উৎসর্গ করে যাতে করে ক্ষমতাসীনরা বাস্তব থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন। অনেকের মধ্যে এক ধরনের রোগের সৃষ্টি হয় যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয় হিলোসিনোজেন। এই রোগ হলে মানুষ শত্রুকে আপন মনে করে এবং আপনকে শত্রু মনে করে থাকে। আশপাশের লোকজন প্রতিনিয়ত এবং অনবরত তেলবাজি করলে এবং কানকথা শোনার অভ্যাস থাকলে এই রোগ এমনিতেই হয়ে যায়। আবার অনেক সময় ওষুধ খাইয়েও এই রোগ সৃষ্টি করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল হিটলারকে এই জাতীয় ওষুধ খাওয়ানোর জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। কিন্তু হিটলারের আশপাশে এমন কোন বিশ্বাসঘাতককে সেদিন ব্রিটিশ তথা মিত্রবাহিনীর গোয়েন্দারা খুঁজে পায়নি যার মাধ্যমে হিটলারকে ওই ওষুধ খাওয়ানো যেত। ফলে প্রকল্পটি সেই সময় ব্যর্থ হলেও নানা দেশে নানা সময়ে ওষুধটি সার্থকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে ক্ষমতাসীনদের ওপর তাদেরই তথাকথিত বিশ্বস্ত পাত্রমিত্রদের মাধ্যমে। 

লেখক : গোলাম মাওলা রনি, সংসদ সদস্য
প্রকাশ : ২৭শে আগষ্ট ২০১২, যুগান্তর