Showing posts with label Bangladesh Pratidin. Show all posts
Showing posts with label Bangladesh Pratidin. Show all posts

পরকীয়া নয় আপনকীয়া

পরকীয়া নিয়ে কিছু একটা লিখব- এ কথা শুনেই এক পরিচিত লোক বললেন- পরকীয়া বলছেন কেন। ওটা তো আপনকীয়া। এক ঘরের নিচে বাস করলেও স্বামী-স্ত্রী যেন একে অপরের থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তব সমস্যাও আছে বটে। কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং ব্যক্তির মন-মানসিকতাও অনেকাংশে দায়ী পরকীয়া নামক এ ব্যাধির জন্য। আমি প্রথমে নিজের কিছু ঘটনা বলি- প্রায় ২৬ বছর হতে চলল আমার বিয়ের বয়স। প্রথম কয়েক মাস বেশ রং-রসের মধ্যেই কাটল। এরপর রূঢ় বাস্তবতা, অর্থকষ্ট। তারপর ছেলে সন্তানের জন্ম এবং তাদের মানুষ করার নিরন্তর প্রচেষ্টা। স্ত্রীর দিকে তাকাতেই ফুরসত পাইনি, অন্যদিকে তাকানো তো দূরের কথা। অথবা সুযোগই পাইনি বা আসেনি। আসলে কী হতো তা জানি না, এরই মধ্যে সিকি শতাব্দীর দাম্পত্য জীবনে আমরা একে অপরের মন্দগুলোই যেন ভালোবাসার পুষ্পমাল্য বানিয়ে নিয়েছি। যেমন আমার ভীষণ অপছন্দ নাক ডাকা। ইদানীং লক্ষ্য করলাম তিনি নাক ডাকছেন। অভিযোগ করতেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠার অবস্থা। উল্টো অভিযোগ, আমি নাকি নাক ডাকি এবং তা ট্রাকের ইঞ্জিনের শব্দকেও ফেল করে। কি আর করা। কখনো ঘুম ভেঙে গেলে ওই শব্দ শুনে পছন্দের রবীন্দ্রসংগীত মনে করে ছন্দ মেলাতে শুরু করলাম। চিৎ হয়ে শুয়ে নিজের পেটটাকে তবলা বানিয়ে ছন্দে অতিরিক্ত লালিত্য মেশানোর চেষ্টা করলাম। ওষুধের মতো কাজ দিল। এখন অভ্যাস এমন হয়ে গেছে যে মাঝেমধ্যে ওই ছন্দময় গীতসংগীত শ্রবণের জন্যই হয়তো বা মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়।

যা বলছিলাম; পরকীয়া। পরিচিতজনদের কাছে এসব কথা শুনি। খুবই রগরগে। আমার মতো নিরামিষভোজীও উত্তেজিত হয়ে উঠি। ভয়ঙ্কর সব লালসার গল্প। নিজে যেরূপ অন্যায়ের পথে সমর্পিত হচ্ছে, তদ্রূপ ইচ্ছা করেই স্ত্রী, কন্যা, পুত্রবধূদের অনৈতিক কাজে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি। মদ, জুয়া ও অশালীনতার শত সহস্র আসর ঢাকার অভিজাত পল্লীগুলোতে জমজমাট হয়ে ওঠে; বিশেষত সন্ধ্যার পর। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের মানসিকতা। কোনো মানুষ যে পরকীয়া দোষে দোষী নয়- এ কথা আর বিশ্বাস করানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশ প্রতিদিনে আমার দুটি লেখা ছাপা হওয়ার পর আমি এত টেলিফোন এবং প্রতিক্রিয়া পেলাম যে তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। প্রথম লেখাটি ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা, অন্তরালে যৌনতা এবং দিনান্তের পতন। মূলত এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক লেখা। রাজা-বাদশাদের অনৈতিক, প্রেম ও দুর্ভাগ্যজনক পরিণতির কয়েকটি উপাখ্যান। অনেক রাজনৈতিক নেতার স্ত্রী ফোন করে তাদের স্বামীদের অপকর্মের কথা বলল, এমনকি নামধাম প্রকাশ করে আমাকে তাদের দুঃখের কাহিনী প্রকাশ করতে বলল। কয়েকজন ফোন করে দেখা করতে চাইল। নিজেদের সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের রক্ষিতা বলে পরিচয় দিল এবং তাদের কাহিনীগুলো আমাকে জানাতে চাইল।

অন্য একটি লেখা ছিল- 'শাওনের কান্না, মিলি ভাবী এবং আমার প্রেম'। এটাও অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল। বন্ধুবর সম্পাদক নঈম নিজামের প্রতি ভীষণ রাগ হলো। কারণ শিরোনামটি তারই দেওয়া- আমারটি ছিল অন্যরকম। যারা পড়ল তারা বিভিন্নভাবে ঘটনাটি ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করল। যারা শুধু শিরোনাম পড়ল তারা আমাকে সরাসরি চরিত্রহীন ভাবল। অনেকে আবার অন্যের মুখে শুনে আমাকে বাঁকা হাসি দিয়ে প্রশ্ন করল, আমি প্রমাদ গুনলাম স্ত্রী মহোদয়াকে নিয়ে। ঢাকার বাইরে ছিলাম। এসে বুঝলাম সে পড়েনি। শাওন মানে লেখক হুমায়ূন আহমেদের বিধবা স্ত্রী। কোনোদিন কথাও হয়নি কিংবা চাক্ষুষ দেখিনি। তার মা আমাদের সহকর্মী। সবাই অভিযোগ করছে, শাওন কেবল অর্থলোভেই হুমায়ূনকে বিয়ে করেছে। আমার মনে হলো, এটা ঠিক নয়। সে সত্যি অর্থেই হুমায়ূনের মেধা ও লেখক প্রতিভাকে ভালোবেসেছে। তার বয়সে সে স্বাভাবিকভাবেই সুদর্শন কোনো যুবককে ভালোবাসবে। অন্যদিকে অর্থের জন্য ভালোবাসার তো প্রশ্নই আসে না। যে কারণে মানুষের অর্থলোভ হয় সেটি তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সে ধনীর মেয়ে এবং হুমায়ূন আহমেদের বিত্ত-বৈভবের তুলনায় তার পৈতৃক ধনসম্পত্তি অনেক বেশি। অন্যপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাজহারকে নিয়ে যে সন্দেহ অনেকে করছে তাও আমার কাছে বিকৃত রুচির মানসিকতাই মনে হয়েছে। যে মানুষটি অসুস্থ হুমায়ূনের শিয়রে ছিলেন বছরের পর বছর। ব্যয় করেছেন কোটি কোটি টাকা। ব্যবসা, বাণিজ্য, অফিস ছেড়ে যেভাবে তিনি হুমায়ূন আহমেদের পাশে থেকেছেন- সেই দৃষ্টান্ত আমি নিকট বর্তমানে দেখিওনি কিংবা শুনিওনি। কাজেই মানবিকতাবোধ থেকেই তাদের পক্ষে লিখেছি। কিন্তু সমাজের বিকৃত মানুষেরা সরাসরি আমাকেই আক্রমণ করে বসল। কেউ বলল- আপনি কে? আপনার লেখার কী দরকার ছিল! আপনার তো একটি ইমেজ রয়েছে। কেন এসব ফালতু বিষয় নিয়ে লিখতে গেলেন ইত্যাদি। অদ্ভুত একটি এসএমএস পেলাম অজানা জায়গা থেকে। সে লিখেছে- 'তোর গায়ের রং যেমনি কালো, তেমনি তোর অন্তরটা আরও কালো। তাই কালিয়ার খোঁজে নেমেছিস।'

অদ্ভুত এই বিচিত্র সেলুকাসের দেশে মানুষের মন যে কিরূপ বিকৃত হয়ে পড়েছে তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। বিষয়টি নিয়ে অনেকের সঙ্গে আলোচনা করলাম এবং পরকীয়ার মনস্তাত্তি্বক কিছু বিষয় বোঝার চেষ্টা করলাম। ইচ্ছা ছিল খুশবন্ত সিংয়ের মতো নিজের জবানিতে লিখব। কিন্তু সম্মানিত পাঠকদের কথা ভেবে সাহসী হলাম না। একটি কল্পিত চরিত্রের মাধ্যমে আমার দেখা সমাজের কিছু দৃশ্যের কথা আপনাদের বলছি- জয়নাল সাহেব এখন বেশ সচ্ছল। বয়স আনুমানিক পঞ্চাশের কাছাকাছি। ব্যবসা করেন। লোকজন তাকে ভালো মানুষ হিসেবেই জানে। সত্তরের দশকে প্রথম সিনেমা দেখেন রূপবান। নায়িকা সুজাতাকে তার খুবই পছন্দ হয়। সিনেমাটিতে রূপবানের বয়স ১২ বছর আর নায়কের বয়স ১২ দিন। জয়নাল সাহেবের সেই থেকেই চিন্তা- ১২ দিনের ছেলে রহিমের যদি বিয়ে হতে পারে, তবে ১৪ বছরের জয়নালের কেন নয়। সে সিনেমাটি কয়েকবার দেখল। গানগুলো সব মুখস্থ হয়ে গেল। তার নায়িকা রূপবানকেও ভালো লাগল, আবার ভিলেন নায়িকা তাজেলকেও ভালো লাগল। তার প্রশ্ন জাগল, দুটি বউ থাকলে কি এমন হয়! তার দাদার তো চারটা বউ রয়েছে। যেই কথা সেই কাজ- ১৪ বছরের কিশোর জয়নাল হন্যে হয়ে পাত্রী খুঁজতে লাগল। খুঁজতে লাগল মানে প্রেম করার সুযোগ খুঁজতে লাগল। সময়টা সত্তরের দশক। সমাজ অনেকটা কনজারভেটিভ। মেয়েরা আরও বেশি। জয়নাল সাহেব যত বেশি বেশি মেয়েদের দিকে তাকায় তারা ততই বিরক্ত হয়। কয়েকটি মেয়ে তাদের অভিভাবকের কাছে নালিশ করল। কেউ কেউ স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের কাছে অভিযোগ করল। জয়নালকে শিক্ষকরা বেশ মারল। মার খেয়ে তার প্রেমাকাঙ্ক্ষা আরও বেড়ে গেল। বিশেষত হিন্দু মেয়েদের প্রতি তার মোহ ছিল বেশি। কেন জানি হিন্দু মেয়েদের তার খুব রূপসী মনে হতো। আর প্রায় সব হিন্দু মেয়েই গান জানে। জয়নাল সাহেব আবার শৈশব থেকেই ছিলেন সংগীতপ্রিয়।

কথায় আছে- মানুষ যা আকাঙ্ক্ষা করে এবং চেষ্টা করে, ফলাফল সেরকমই হয়। জয়নাল সাহেব বিয়ে করে ফেললেন অল্প বয়সেই। প্রথম কয়েক মাস খুব রং-রসের মধ্যে গেল। স্ত্রী সুন্দরী, অনুগতা এবং পতিব্রতা। বেশ ভালোই যাচ্ছিল। কিন্তু বিপত্তি বাধাল রূপবান সিনেমার কাহিনী। জয়নাল সাহেবের বার বার মনে হচ্ছিল, খল নায়িকা তাজেলের কথা। তার মনে হলো তাজেলের মতো আরেকটা মেয়ে পেলে মন্দ হতো না। চুপি চুপি কিছুদিন প্রেম করবে। তারপর একদিন বিয়ে করবে। দুই বউ। বেশ মজাই হবে। জয়নাল সাহেব মনে মনে ভীষণ উত্তেজিত। কল্পিত তাজেলকে সে পাশে বসায়, খাইয়ে দেয়। মাঝেমধ্যে খুনসুঁটিও করে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময়। স্ত্রী বকা দেয়- কেন সে শুয়ে শুয়ে একা একা বিড় বিড় করে! জয়নাল সাহেবের পরিবার বেশ ধর্মপরায়ণ। জয়নাল সাহেবও তদ্রূপ। বিয়ের কিছুদিন পরই সে দাড়ি রাখা শুরু করল।

তাজেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করার জন্য জয়নাল সাহেব উঠেপড়ে লাগল। সময় পেলেই বিভিন্ন মার্কেটে যায়। সেখানে অনেক মেয়ে দেখে কিন্তু পছন্দ হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজের সামনেও অনেক ঘুরল। এবার অনেককে পছন্দ হলো। কিন্তু কীভাবে তাদের সঙ্গে প্রেম করবে তা ভেবে পেল না। নিজের ক্লিন ইমেজের জন্য বিষয়টি বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গেও আলোচনা করতে পারছে না। পরিকল্পনা করতে হচ্ছে নিজে নিজেই। সে ভাবল টেলিফোনে রং নাম্বারে ফোন করে হয়তো কোনো ফল পাওয়া যেতে পারে। যেই কথা সেই কাজ। প্রতিদিন বিকালে এক ঘণ্টা সময় নিয়ে সে গুলশান, বনানী ও ধানমণ্ডির ফোন নম্বরগুলোতে চেষ্টা করতে থাকল। এবার সে প্রতিজ্ঞা করল- যেহেতু রিস্ক নিয়ে প্রেম করবে সেহেতু প্রেমিকাকে হতে হবে ধনীর কন্যা, সুন্দরী এবং কিছুটা দেমাগী- অনেকটা তাজেলের মতো। চেষ্টা চলল। কিন্তু সহসা কিছু হলো না। জয়নাল সাহেব হাল ছাড়লেন না। এরই মধ্যে ধানমণ্ডির একটি নম্বরে কাঙ্ক্ষিত কাউকে পেয়ে গেলেন। কিশোরী মেয়ে। সবে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। জয়নাল সাহেবের তুলনায় ১২ বছরের ছোট। জয়নাল সাহেব নিজের বয়স কমিয়ে বললেন। মজার মজার কথা এবং নিজের পরিণত বয়সের চাতুরীমূলক অভিজ্ঞতার অভিনব বর্ণনে তিনি মেয়েটাকে প্রায় পাগল বানিয়ে ফেললেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে প্রেমালাপ। এভাবে চলল প্রায় ১৫ দিন। মেয়েটির সুললিত কণ্ঠ এবং বংশ-পরিচয় তার খুবই পছন্দ হলো। টেলিফোনে উচ্চতা, গায়ের রং, চুলের স্টাইল, আত্দীয়স্বজন এবং আর্থিক অবস্থার বিবরণ নিলেন। সবই পছন্দের। এবার চর্মচক্ষে দেখার পালা। কিশোরীও পাগলপ্রায়। জয়নাল সাহেব চিন্তা করেন কীভাবে মেয়েটাকে ভাগিয়ে নিয়ে বিয়ে করা যায়। আইনগত বাধা ছিল না, কারণ তখনো বাল্যবিবাহ বা বহুবিবাহ নিরোধ আইনটি হয়নি। বাধা শুধু সামাজিক। জয়নাল সাহেব ভাবলেন- পালিয়ে কোথাও চলে গেলে এবং বিয়ে-থা হয়ে গেলে বোধহয় তেমন সমস্যা হবে না। উভয়ের সম্মতিতে দেখা-সাক্ষাতে দিনক্ষণ ঠিক হলো। মেয়েটি এলো। জয়নাল সাহেবও গেলেন। কিন্তু একে অপরকে দেখার পর উভয়েই হতাশ হলেন। মেয়েটি জয়নাল সাহেবের বয়স, উচ্চতা এবং দাড়ি দেখে মনে মনে বিরক্ত হলো। জয়নাল সাহেবের আত্দসম্মানে ভীষণ লাগল। অন্যদিকে জয়নাল সাহেব যেমনটি আশা করেছিলেন মেয়েটি তেমন সুন্দরী ছিল না। বিশেষত তার উপরের পাটির দাঁত একটু উঁচু থাকায় বার বার শুধু নিজের রূপবানের কথাই মনে পড়ছিল। আলোচনা জমল না, ঘণ্টাখানেক ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে এলোমেলো ঘোরাফেরা করে তারা যে যার স্থানে ফিরে এলো। এরপর কয়েকদিন টেলিফোনে হালকা কথাবার্তা হলো। কিন্তু জমল না। জয়নাল সাহেব রাগের চোটে দাড়ি কামিয়ে ফেললেন। লোকজন জিজ্ঞাসা করল হায়! হায়! এটা কী করলে। জয়নাল সাহেব বললেন- দেশের অবস্থা ভালো না। দাড়িওয়ালা যুবকদের দেখলেই লোকজন ছাত্রশিবিরের কর্মী মনে করে- তাই দাড়ি কামিয়ে ফেললাম। তাজেলের খোঁজে জয়নাল সাহেব যখন প্রাণান্ত চেষ্টা করছেন তখন রূপবানের ঘরে দুটি সন্তান জন্ম নিল। বিবাহিত জীবনেরও প্রায় ১৪-১৫ বছর হতে চলল। ইতোমধ্যে রূপবানরূপী স্ত্রীর রূপেও কিছুটা ভাটা পড়েছে। সাংসারিক কাজে প্রায়ই খটর-মটর লাগে। স্ত্রী ঝগড়া শুরু করল। মাঝেমধ্যে গালিও দেয়। আর ঝগড়া লাগলে স্ত্রী গ্রাম্যভাষায় তুই-তুকারি শব্দ ব্যবহার করে। ধর্মভীরু জয়নাল সাহেব নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকল- হায় আল্লাহ, এই ডাইনিটা যেন মারা যায়। এভাবেই চলছিল। কিন্তু এর মধ্যে সে জানল যে, কারও জন্য মৃত্যু কামনা করলে নাকি তার আয়ু বাড়ে। সে ভয় পেয়ে গেল। এখন কি হবে। সে কি স্ত্রীর দীর্ঘায়ু কামনা করবে। স্ত্রীর দীর্ঘায়ু চেয়ে মোনাজাত করার চেষ্টা করল। কিন্তু মন সায় দেয় না। সিদ্ধান্ত নিল, এ ব্যাপারে সে আল্লাহকে কিছুই বলবে না। যাই হোক সে ঘরে সময় কম দেওয়া শুরু করল এবং তাজেল খোঁজার কাজ পুনরায় আরম্ভ করল। ইতোমধ্যে জয়নাল সাহেব ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ প্রসার লাভ করেছেন। ব্যবসায়ী সমাজে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছেন। অনেক ধনাঢ্য ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার সখ্যও গড়ে উঠেছে। বিদেশেও যাওয়া পড়ছে ঘন ঘন। অনেক পরিচিতজনের জীবনই দেখলেন অশ্লীলতায় পূর্ণ। তারা বিভিন্ন মহিলার সঙ্গে অবৈধ প্রণয় করছে। শারীরিক মেলামেশা করছে। অনেকে এই প্রণয়কর্মের জন্য আলাদা বাড়ি কিংবা বাগানবাড়িও নির্মাণ করেছে। অনেকে আবার পাঁচতারা হোটেলগুলোকে ব্যবহার করছে দিনে কিংবা রাতে। পুরুষদের প্রণয়ের সঙ্গী হচ্ছে বিবাহিত মহিলারা, বিশেষত ধনাঢ্য পরিবারের মহিলারা। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু তরুণীও শয্যাসঙ্গী হচ্ছে- তবে অর্থের বিনিময়ে। এর বাইরে হাই সোসাইটির কলগার্লদের সঙ্গেও কিছু পরিচিত ব্যবসায়ীর নিয়মিত যোগাযোগ তার দৃষ্টিগোচরে এলো। কিছু রসিক ব্যবসায়ী আবার দেশ-বিদেশের পরিচিত নায়িকা বা মডেল কন্যাদের সঙ্গে তাদের দহরম-মহরমের রসালো গল্প জয়নাল সাহেবের কাছে বলল। কিন্তু এসব কোনো কিছুই তাকে আকর্ষণ করল না। সম্ভবত আজন্ম কঠিন পারিবারিক শিক্ষা ও নীতি-নৈতিকতাবোধ তাকে অবাধ যৌন সম্পর্কের ব্যাপারে আগ্রহী করল না। বন্ধুরা তাকে বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করল। কেউ কেউ নিজেদের বান্ধবীদের উপহার প্রদানের কথা বলল। কেউ কেউ আবার বলল- যাও পারলে আমার স্ত্রীর সঙ্গে প্রেম কর, কিছু বলব না। জয়নাল সাহেব মনে মনে 'লা হাওলা' পড়েন। এসব অশ্লীল মানুষকে এড়িয়ে চলা আরম্ভ করলেন। ফলে বেশ কিছু দিন তার মন ভারি হয়ে রইল। এদিকে জয়নাল সাহেবের স্ত্রীর সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়তেই থাকল। নিজের বংশ-আভিজাত্য ধর্মবোধ এবং পারিবারিক শিক্ষার কারণে তিনি চাইলেন স্ত্রীর সঙ্গে একটি মোহময় ও প্রেমময় সম্পর্ক গড়ে তোলার। কিন্তু স্ত্রী যেন কেমন। সবকিছুতেই তার একটা গেঁয়ো ভাব। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে প্রেম-রোমান্টিকতা যে থাকতে পারে তা ভদ্রলোকের স্ত্রী বুঝতেই চান না। রান্না-বাড়া, ঘরের কাজ, সন্তান-সন্ততি দেখাশোনা করা এবং কালেভদ্রে স্বামীর শয্যাসঙ্গী হওয়াকেই তিনি তার দায়িত্ব মনে করেন। অন্যদিকে জয়নাল সাহেব চান স্ত্রীর সঙ্গে সব বিষয় শেয়ার করতে। নিজের ব্যবসা-বাণিজ্য, ভালোলাগা সবকিছুই স্ত্রীকে বলতে চান। কিন্তু এতে স্ত্রী ভীষণ বিরক্ত হন। জয়নাল সাহেব যদি দীর্ঘক্ষণ নামাজ পড়েন কিংবা বই পড়েন বা গান শোনেন- সব কিছুতেই স্ত্রীর আপত্তি। স্ত্রী চান জয়নাল সাহেব যেন ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নেন। সকাল-বিকাল পালা করে তাদের পড়ান। স্কুলে নিয়ে যান। ঘরের কাজে স্ত্রীকে সাহায্য করেন। বাজারঘাট নিয়মিত করেন ইত্যাদি। জয়নাল সাহেবের বক্তব্য, ওইগুলো তো টাকা দিয়েই করা যায়। ঘরের কাজ বুয়ারা করবে। রান্নার কাজ বাবুর্চি করবে। ছেলেমেয়েদের জন্য গৃহশিক্ষক রাখা হবে। নাহ, তা হবে না- স্ত্রীর সাফ জবাব। জয়নাল সাহেব অনেক কষ্ট করে গ্রাম থেকে কাজের ছেলে বা মেয়ে আনেন। আর স্ত্রী মারধর করে তাড়িয়ে দেয়। এ নিয়ে গ্রামে জয়নাল সাহেবের স্ত্রীর বদমেজাজের বেশ সুখ্যাতি হয়ে গেছে। গ্রাম থেকে আর কাউকে আনা যাচ্ছে না। ফলে ভদ্র মহিলাকে সব কাজ একাকীই করতে হয়। এ নিয়ে জয়নাল সাহেবের স্ত্রীর প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই। বরং প্রচণ্ড রাগ হয়। কাজের লোকদের সঙ্গে ঝগড়াঝাটি তিনি একদম পছন্দ করেন না। আর স্ত্রীর এ ধরনের গৃহকর্মে মনোনিবেশও তার অপছন্দ। তিনি চান স্ত্রী তার অফিসে মাঝেমধ্যে আসুক। সামাজিক জীবনের সঙ্গিনী হোক এবং অবসরে তার সঙ্গে প্রেম করুক। কিন্তু স্ত্রীর ভালোবাসা যেন গৃহকোণে বন্দী থাকার মধ্যে এবং সারা দিনের কর্মশেষে যখন জয়নাল সাহেব বাসায় ফেরেন তখন তার সঙ্গে ঝগড়া করার জন্য নিত্যনতুন পরিকল্পনা প্রণয়নের মধ্যে। ফলে দূরত্ব বাড়তেই থাকে। অন্যদিকে জয়নাল সাহেবের মনও তাজেলের খোঁজে পুনরায় অস্থির হায় ওঠে। মনের মতো আরেকটা বউ পাওয়ার জন্য জয়নাল সাহেবের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তার রোমান্টিক মন। সে বিয়ে করার আগে বউয়ের রোমান্টিকতা যাচাই করতে চায়। এ জন্য দরকার প্রেম করা। অন্যদিকে বর্তমান স্ত্রী বা সন্তানদের প্রতি দায়িত্ববোধও তাকে তাড়িত করে। স্ত্রী ও সন্তানদের সে প্রচণ্ড ভালোবাসে। স্ত্রীকে মনের মতো করে না পাওয়ার বেদনা থেকেই সে বিকল্প কিছু একটা খুঁজছে। খোঁজাটা আবার যেনতেন নয়। সে চাচ্ছে তার হবু দ্বিতীয় স্ত্রী রূপ-গুণ-বংশ মর্যাদায় তার প্রথম স্ত্রীর তুলনায় শ্রেষ্ঠ হোক। বর্তমান স্ত্রী প্রায়ই তাকে খোটা দেয়- আমার মতো স্ত্রী আর পাবে না। মরলে দেখো, আরও একটা বিয়ে করে দেখো, তোমার যে অভ্যাস- আমি বলে ঘর করে গেলাম। অন্য মহিলা হলে একদিনও তোমার সঙ্গে থাকতে পারবে না ইত্যাদি। জয়নাল সাহেব উত্তর দেন না। কিন্তু মনে মনে জিদ ধরেন- যা থাকে ভাগ্যে! কিছু একটা এবার করে দেখাতেই হয়। এদিকে বয়স বেড়ে যাচ্ছে। চুলেও পাক ধরেছে। এ অবস্থায় কী করে আরেকটি বিয়ে করা যায়। বিষয়টা নিয়ে এক বন্ধুর সঙ্গে সে খোলামেলা আলোচনা করলেন। বন্ধু বললেন- আরে বোকা, যারা দ্বিতীয় বিয়ে করে তারা কখনো প্রথম স্ত্রী নিয়ে এত ভাবে না। হঠাৎ করে ফেলে। কিন্তু কীভাবে? বন্ধু বলে বিয়ের কথা গোপন রেখে কারও সঙ্গে প্রেম কর, অথবা বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বল যে, তোমার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না ইত্যাদি ইত্যাদি। সবই তো বুঝলাম- বলেন জয়নাল সাহেব। কিন্তু যাব কোথায়? তাকে পাব কোথায়? একবার সিদ্ধান্ত নেয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেবেন। কিন্তু সাহস হয় না। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেন, একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈকালিক সেশনে এমবিএ-তে ভর্তি হবেন। উদ্দেশ্য সেখানে হয়তো কোনো সুন্দরী এবং যোগ্য মেয়েকে পাওয়া যেতে পারে। হোক না বিধবা, কিংবা তালাকপ্রাপ্ত। দু'একটি সন্তান থাকলেও আপত্তি নেই। আগে কুমারী বা অবিবাহিত কাউকে কল্পনা করা যেত। এখন আর সম্ভব নয়। যেমন চিন্তা তেমন কাজ। একটি স্বনামধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। খরচ পড়ল প্রায় ৫০ হাজার টাকা। প্রথম দিন ক্লাসে যাওয়ার আগে উত্তেজনায় ঘুমাতে পারলেন না। না জানি কতজন মেয়ে ভর্তি হয়েছে। তারা দেখতেই বা কেমন হবে। তার সঙ্গে প্রেম করবে তো। ইত্যাদি চিন্তা করতে করতে নির্ঘুম রাত অবশেষে পোহাল। সারাদিন গেল উত্তেজনায়। অবশেষে বিকালে ক্লাসে গেলেন জয়নাল সাহেব। ওরে বাবা, একি! প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মেয়ে মাত্র চার-পাঁচজন। তাও আবার একে অপরের চেয়ে কুৎসিত। এর মধ্যে সবচেয়ে কুৎসিত মেয়েটি জয়নাল সাহেবের পাশে বসল। একেবারে গাঘেঁষে। বয়সও তো মনে হচ্ছে তার চেয়ে বেশি। গা থেকে ঘামের গন্ধ আসছিল। জয়নাল সাহেব তাকাতে ভয় পাচ্ছিলেন। মেয়েটিই উদ্যোগী হয়ে কথা বলল। মুখ থেকে দুর্গন্ধের ঝাপটা জয়নাল সাহেবকে আক্রমণ করল। তিনি ওয়াশ রুমে যাওয়ার কথা বলে ক্লাসরুম ছাড়লেন। আর কোনোদিন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দিয়েও হাঁটেননি।

জয়নাল সাহেবের ক্লান্ত এই প্রেমযাত্রায় সত্যিই এবার ফুল ফুটল। এক ভদ্র মহিলার সঙ্গে হঠাৎ পরিচয় হলো। বেশ সুন্দরী ও লম্বা। গায়ের রং দুধে আলতা। ঠিক যেমনটি তিনি কল্পনা করতেন। বংশও ভালো। ব্যবসা করেন। বোরকা পরেন, কিন্তু নিচে জিন্স প্যান্টও পরেন। নিজে গাড়ি ড্রাইভ করেন। নামাজ-কালাম, কোরআন পড়া, নফল ইবাদত-বন্দেগি, রোজা রাখার মতো ধর্মীয় গুণাবলীর সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক গানের গলাও বেশ দরাজ। বিবাহিত। বয়স ২৮-২৯ বছর হবে। দুটো সন্তান রয়েছে। স্বামীর সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না। ধর্মভীরু জয়নাল সাহেব মনে করলেন, এবার বোধহয় আল্লাহপাক তার প্রতি রহম করেছেন। আলাপ জমে উঠল- ফোনে ফোনে। কারণ দেখা হয়েছে মাত্র একবার এবং তিনি পর্দার কারণে দেখা-সাক্ষাতে আগ্রহী নন। প্রেয়সীর বয়স যেহেতু কম, সেহেতু জয়নাল সাহেবকেও শারীরিকভাবে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তিনি নিয়মিত ব্যায়াম শুরু করলেন। ডাক্তারের কথামতো সন্ধ্যা ৮টার মধ্যে খাবার খান। এরপর হাঁটতে বের হন। টানা দেড় ঘণ্টা হাঁটেন ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে। হাঁটতে হাঁটতে যখন জাহাজ মার্কা বাড়ির সামনে দাঁড়ান তখন সেখানে প্রেমরত তরুণ-তরুণীদের দিকে আড় চোখে তাকান। বেশ জড়াজড়ি করে তারা বসে থাকে। কী করে অন্ধকারে তা স্পষ্ট দেখা না গেলেও বোঝা যায় আপত্তিকর কিছু একটা করছে। আগে খুব রাগ হতো এ ধরনের দৃশ্য দেখলে। মনে হতো একটি লাথি দিয়ে ওদের তাড়িয়ে দেন। কিন্তু এখন হয় না। বরং এক ধরনের মায়া লাগে। আহারে! বেচারারা কোনো সুযোগ পাচ্ছে না। সে মনে মনে ভাবে বিয়ের পর নববধূকে নিয়ে প্রায়ই সে ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে বসবে। বিশেষত জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাতে। বাদাম কিংবা পপকর্ন খাবে এবং পছন্দের গানগুলো তাকে গেয়ে শোনাবে। এভাবেই চলল প্রায় ১৫-২০ দিন। এরই মধ্যে ঘটে গেল আরেক দুর্ঘটনা। জয়নাল সাহেবের দীর্ঘদিনের পরিচিত এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। খানিকটা প্লেবয় প্রকৃতির। কথা প্রসঙ্গে জানাল, সে তার হবুবধূ বন্ধুটির বেশ পরিচিত। নিজের মনের কথা গোপন রেখে সে মেয়েটির খোঁজখবর জানতে চাইল। সমাজে সৎ মানুষ হিসেবে যেহেতু জয়নাল সাহেব ব্যাপক পরিচিতি এবং বিশ্বস্ততা রয়েছে, তাই বন্ধুটি কোনো সন্দেহ করল না। বরং নির্দ্বিধায় মেয়েটির ইতিহাস বর্ণনা করল। জানা গেল, মেয়েটি মূলত হাই সোসাইটির কলগার্ল। সমাজের অনেক বিত্তবানকে সে সর্বনাশ করেছে। কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না জয়নাল সাহেবের। বন্ধুটি কয়েকজনের নাম বললেন এবং এও বললেন- কে কত টাকা ওই মেয়ের পেছনে খরচ করেছে। জয়নাল সাহেব এসএমএস দিয়ে মেয়েটিকে ঘটনার সত্যতা জিজ্ঞাসা করলেন এবং মেয়েটিও নির্দ্বিধায় সব স্বীকার করল। মাথায় যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো জয়নাল সাহেবের। মনের দুঃখে তিনি চলে গেলেন ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে সেই জাহাজ মার্কা বাড়িটির কাছে। রাত তখন প্রায় ১১টা। কোনো প্রেমিক জুটিই সেখানে ছিল না। কেবল জয়নাল সাহেব একা। আনমনে তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে। জ্যোৎস্নাপ্লাবিত চাঁদের দিকে। কোনো খেয়াল ছিল না। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেলেন; কাঁধে কার যেন শক্ত হাতের স্পর্শে। তাকিয়ে দেখলেন একজন হিজড়া তার ঘাড়ে হাত রেখে অশ্লীলভাবে হাসছে। ভয়ে জয়নাল সাহেবের মুখ পাংশু বর্ণ হয়ে গেল। কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে গেছে। চিৎকার দিয়ে কাউকে ডাকবেন সেই শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন...।
প্রকাশঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন, শুক্রবার ২৬ অক্টোবর ২০১২

শাওনের কান্না মিলি ভাবী এবং আমার প্রেম

অভিনেত্রী শাওন কাঁদছেন। সম্ভবত লেখক হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াত আত্দাও কাঁদছে। কাঁদছে বিশ্বব্যাপী হুমায়ূনের কোটি কোটি ভক্ত ও অনুরাগী। শাওনের মা তহুরা আলী আমার প্রিয় সহকর্মী। সংসদ সদস্য। তার বাবাও দেশের প্রথিতযশা ব্যবসায়ী। আমি তাদের চিনেছি অনেক পর। শাওনকে চিনেছি আগে। আশির দশকে নতুন কুঁড়ির মাধ্যমে। চিনতাম ঈশিতা এবং তারিনকেও। বাংলাদেশের কোটি কোটি টেলিভিশন দর্শকের কাছে অত্যন্ত প্রিয় নাম শাওন। ঈশিতা বিয়ে করে সুখী জীবনযাপন করছে। অনিয়মিতভাবে টেলিভিশন পর্দায় হাজির হলেও তার সুখী জীবন আমাদের আনন্দিত করে। তারিনের বিয়ে বিচ্ছেদের পর আমরা ব্যথিত হয়েছিলাম, পরবর্তীতে এ নিয়ে তেমন কোনো বিতর্ক না হওয়ায় আমরা উৎকণ্ঠিত হইনি। কিন্তু ব্যতিক্রম ঘটল শাওনের জীবনে।

শাওন যখন হঠাৎ করেই লেখক হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন- সারা দেশে সমালোচনার ঝড় উঠল। চারদিকে ছি: ছি: রব উঠল। বলতে গেলে কোনো বাছ-বিচার না করেই। হুমায়ূন আহমেদ বাধ্য হয়েই একটি জাতীয় দৈনিকে আত্দপক্ষ সমর্থন করে কলাম লিখলেন; কিন্তু সমালোচনা থামল না। আমি এ বিষয় নিয়ে অনেকের সঙ্গে আলাপ করলাম। দেখলাম সবাই বিরূপ। আমি বিষয়টি ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার চেষ্টা করেছি। যদিও বয়সের দিক থেকে প্রেম ও প্রণয়টি অসম ছিল; কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তা অনৈতিক, বেআইনি বা অবৈধ ছিল না। বরং চিরন্তন প্রেমের দুর্বার আকর্ষণে মেধাবী শাওন কিভাবে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং হুমায়ূন আহমেদের মতো বিদ্বজ্জন-পণ্ডিত মানুষ সমাজ সংসারের মতো বাধা উপেক্ষা করে প্রেয়সীর হাত ধরে এগিয়ে গিয়েছিলেন- তা ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। আমার জানা মতে, হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তার মনোমালিন্য ছিল দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের শিল্প ও সাহিত্যাঙ্গনের অনেকেই তা জানত। জানত একথাও যে, তারা দুই বছর কার্যত আলাদা বসবাস করছিলেন। হুমায়ূনের মনের এই অন্তর্দহনের সন্ধিক্ষণে সম্ভবত শাওনের আগমন।

হুমায়ূন-শাওনের প্রেম ও বিয়ের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো- তারা ভণ্ডামি বা চুপি চুপি কোনো অবৈধ কাজ করেননি। অথচ আমাদের সমাজের প্রচলিত প্রথা হলো-বিখ্যাত মানুষেরা অহরহ কোনো কেলেঙ্কারি করে যাবেন আর সমাজ তা চেয়ে চেয়ে দেখবে। যে সময় হুমায়ূন-শাওনের প্রণয় সংঘটিত হয় ওই সময় হুমায়ূন একজন ডিভোর্সি নিঃসঙ্গ পুরুষ হিসেবে ছিলেন। প্রচলিত সমাজে এ বিয়ে নিয়ে কোনো কথাই হতো না, যদি না পাত্র-পাত্রী হুমায়ূন আহমেদ ও শাওনের মতো বিখ্যাত না হতেন।

টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে শাওন বলার চেষ্টা করেছেন তাদের দাম্পত্য জীবনের পারিপাশ্বর্িক বেদনা ও অন্তর্ঘাত সম্পর্ক। কিন্তু আমার বিশ্বাস, সারা জীবনের নাট্যাভিনয়ের মতো কুশলতা জানা সত্ত্বেও নিজের জীবননাট্যে তিনি অভিনয় করতে পারেননি। তিনি ছিলেন বাকরুদ্ধ এবং যা বলা উচিত ছিল তা আবেগের কারণে গুছিয়ে বলতে পারেননি। হুমায়ূন-শাওন প্রাণান্ত চেষ্টা করেছিলেন একটি সুখী গৃহকোণ গড়ে তোলার। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি তারা সেটি পারেননি। আমাদের সমাজ সেটি করতে দেয়নি। দু'পরিবারের নিকটজনের সমালোচনা, অসহযোগিতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে মানসিক নির্যাতন তাদেরকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল প্রতিনিয়ত। তারা যে ভালো নেই তা আমি বুঝেছিলাম তাদের জীবনযাত্রার ধরন দেখে। বিবাহ পরবর্তী সময়ে হুমায়ূন আহমেদের নাটক ও বিভিন্ন লেখায় সাবেকী টান বা চিরায়ত আকর্ষণ ছিল না। এরই মধ্যে শাওন অন্তঃসত্ত্বা হন এবং কিছুদিন পর তার গর্ভপাত ঘটে। পত্র-পত্রিকায় এ গর্ভপাতের বিষয়ে বিভিন্ন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। কিন্তু আমার মনে হয় শাওনের মনের অশান্তি ও গর্ভপাতের অন্যতম কারণ ছিল। যাই হোক, বছর দুয়েকের মধ্যে এই দম্পতি দৃশ্যত অনেক কিছু গুছিয়ে নিলেও সমাজ তাদেরকে ছাড়েনি।

মেহের আফরোজ শাওন তার বয়সের তারুণ্যের কারণে অনেক সামাজিক বাধা উপেক্ষা করতে পারতেন, কিন্তু হুমায়ূন হয়তো পারেননি। ফলে নিজের অজান্তে তিনি কাঁদতেন। কাঁদতেন প্রতিনিয়ত, বিশেষ করে আগের সংসারের ছেলেমেয়ে নুহাশ, শিলা ও নোভার কথা মনে করে। তারাও হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে খুবই নির্মম আচরণ করতেন। পত্রিকা মারফত জানতে পারলাম, শিলার বিয়ে এবং সেই বিয়েতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আমন্ত্রিত হওয়ার উপাখ্যান। বড়ই বেদনাদায়ক এবং মর্মস্পর্শী। এত বেদনা বহন করার বয়স হয়তো হুমায়ূন আহমেদের ছিল না। ফলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং তার শরীরে ক্যান্সার বাসা বাঁধে। আমার কেন জানি মনে হয়, আমরাই হুমায়ূন আহমেদকে মেরে ফেলেছি এবং তার বিধবা স্ত্রীকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছি।

এ লেখা যখন লিখছি তার কিছুক্ষণ আগে আমাকে মিলি ভাবী ফোন করেছিল আমার একটি লেখার বিষয়ে মন্তব্য জানানোর জন্য। মিলি ভাবী মানে মিলি রহমান। বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের বিধবা স্ত্রী। এরপরই শাওনের সাক্ষাৎকারটির কথা মনে পড়ল। সাক্ষাৎকারের মূল কারণ মনে হচ্ছে, সমাজ সংসারের সমালোচনার জবাবে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার প্রয়াস। চ্যানেল আইয়ের মালিক ফরিদুর রেজা সাগর প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের অত্যন্ত স্নেহধন্য ছিলেন। সম্ভবত সেই কৃতজ্ঞতায় তিনি চ্যানেল আইয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় টকশো অনুষ্ঠান তৃতীয় মাত্রায় শাওনের সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করেন। যা বলছিলাম, সাক্ষাৎকারে শাওন বার বার বলার চেষ্টা করেছেন তিনি হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী হিসেবেই সারাজীবন থাকতে চান। তার এই কথায় আমার মিলি ভাবীর কথা মনে হলো। মিলি রহমান যখন ১৯৭১ সালে বিধবা হন, তখন তো তার বয়স শাওনের চেয়েও কম ছিল এবং তার পারিবারিক এবং পারিপাশ্বর্িক অবস্থা ছিল আরও প্রতিকূলে। কাজেই সেই মিলি ভাবী যদি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্মৃতি নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে পারেন, তাহলে আমাদের শাওন কেন পারবেন না?

আরেকটি বিষয় মনে হলো যে, শাওনের চারপাশের পরিবেশ হয়তো তার ব্যক্তিগত চরিত্রে কিংবা ভবিষ্যৎ প্রণয়ের সম্ভাবনা নিয়ে বিরাম সমালোচনা করছে। হুমায়ূনের মৃত্যুর পর কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় এ নিয়ে বিভিন্ন কল্প- কাহিনীও প্রচার হয়েছে। এক মহাউৎসাহী হুমায়ূন ভক্ততো মামলাই করে ফেললেন। আমার বক্তব্য হলো- শাওনের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার নৈতিক অধিকার কেবল তার নিজের বা ক্ষেত্রবিশেষে পিতামাতার। অযথা সমালোচনা করে তাকে বিব্রত করছি কেন? সেই কবে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিং সতীদাহ প্রথা বন্ধ করেছেন পাক-ভারত উপমহাদেশ থেকে, অথচ প্রায় ২০০ বছর পর আমরা বিধবা শাওনের জন্য সেই প্রথা পুনরায় কার্যকর করতে যাচ্ছি। আমাদের ইচ্ছা- হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গেই শাওনের মরা উচিত ছিল। সেহেতু নিদেনপক্ষে তা হয়নি। কাজেই সারাজীবন সাদা বসনের ধবধবে শাড়ি পরেই শাওনকে সমাজে চলাফেরা করতে হবে।

বর্তমানে শাওনকে ঘিরে যেসব সমালোচনা হচ্ছে তার অন্যতম প্রধান উপকরণ হচ্ছে প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের বিষয়-সম্পত্তি। সবার সন্দেহ- শাওন সব বিষয়-আশয়, সম্পত্তি কুক্ষিগত করেছেন বা করার চেষ্টা করেছেন। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা উচিত যে- হুমায়ূন আহমেদ একজন অধ্যাপক কাম-লেখক ছিলেন। তিনি বিল গেটস, রকফেলার, স্টিভ জবস কিংবা ভারতের ধীরুভাই আম্বানীর মতো ব্যবসায়ী ছিলেন না। তার সহায়-সম্পত্তি বলতে হয়তো ঢাকাতে ২/১টি ফ্ল্যাট, গাজীপুরের অজপাড়াগাঁয়ে 'নুহাশ পল্লী' নামের একটি বাগানবাড়ি বা সেন্টমার্টিন দ্বীপে একখণ্ড জমির ওপর একটি টিনের ঘর। হুমায়ূনের জাদুকরি কলম ও বিভিন্ন নাটকের কারণে ওইগুলোকে অমূল্য সম্পদ মনে হলেও বাস্তব মূল্য কিন্তু বেশি নয়। বাংলাদেশের একজন সাধারণ ধনী ব্যক্তিরও এরচেয়ে বেশি সম্পদ আছে। আর শাওন তো কোনো সাধারণ পরিবারের সন্তান নন। হুমায়ূন আহমেদ হয়তো সারাজীবন সঞ্চয়ের মাধ্যমে তিল তিল করে যে বিষয়-সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন শাওন তার জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি সম্পদ পেয়েছেন। কাজেই হুমায়ূন আহমেদের অন্যান্য নিকটাত্দীয়ের কাছে তার সহায়-সম্পত্তি হয়তো প্রিয় হতে পারে; কিন্তু শাওনের কাছে হুমায়ূনের স্মৃতিই সবচেয়ে মূল্যবান। অন্য কোনো সম্পত্তি নয়। আমি এত দৃঢ়ভাবে শাওনের পক্ষে বলতে পারছি নিজের জীবনের একটি বিবাহ-পরবর্তী পরিণয়ের অভিজ্ঞতা থেকে। শাওন যেভাবে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন তা কোনো মামুলি ঘটনা ছিল না। বিস্ময়কর প্রেমের অবিস্মরণীয় দৃঢ়তা ও ইচ্ছাশক্তি এবং সর্বোপরি মোহময় আকর্ষণে একে অপরের প্রতি আস্থাশীল হয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। কাজেই আমি তাকে শ্রদ্ধা করি। শ্রদ্ধা করি নিজের জীবনের একটি খণ্ডিত ঘটনার বিরূপ অভিজ্ঞতার জন্য। সেটিও ছিল বিবাহ-পরবর্তী প্রেম। যা এসেছিল আমার জীবনে সেই ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে। এক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণী হঠাৎ করেই আমার প্রেমে পড়ে। তরুণীর রূপ, লাবণ্য, শিক্ষা-দীক্ষা এবং বংশ মর্যাদা সব পুরুষের জন্যই একান্ত কাম্য। আমিও আকর্ষিত হলাম। সারা জীবনে কোথাও প্রতারণার আশ্রয় নেইনি। তাই পরিচয়ের প্রথম পর্বেই বললাম, আমি বিবাহিত এবং দু'সন্তানের জনক। খুব কষ্ট হচ্ছিল সত্যি কথা বলতে। কিন্তু বলেছিলাম এই আশায় যে, হয়তো তরুণীটি আমাকে পছন্দ করবে না। প্রথমে সে খুব কাঁদল এবং আমাকে গালাগালও দিল। আমি নির্বোধ ও নির্বাক হয়ে রইলাম। বললাম, আমার কী দোষ। গতকালই তোমার সঙ্গে দেখা হলো এবং বুঝতে পারলাম তুমি আমার প্রতি আকৃষ্ট। তাই সত্য কথা বললাম। এরপরও যদি এগুতে চাও আমি রাজি! কিন্তু সে রাজি হলো না। কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল। ব্যথাভরা হৃদয়ে আমি আমার কর্মস্থলে ফিরলাম এবং মনে মনে তার নাম রাখলাম অনামিকা। কিন্তু তিন/চার দিন পর অনামিকা আমার অফিসে এলো এবং বলল, আমাকে ছাড়া নাকি তার চলবে না। আমার ব্যবসাও তখন ছোট। একটি বউ নিয়ে চলতে কষ্ট। দুই বউ বা সংসার কল্পনাও করতে পারি না। কিন্তু অনামিকার প্রবল আকর্ষণ আমাকেও বিভোর করে তুলল। মনে হচ্ছিল দেখি না কী হয়। সে নিয়মিত অফিসে আসত এবং দীর্ঘক্ষণ অফিসে বসে থাকত। আমার তখন আলাদা রুম ছিল না। সবার সামনে যেমন সে বসে থাকত আর আমিও তাকে বসিয়ে রেখে সব কাজ করতাম। সে আমাকে হুমকি দিত আমি যদি তাকে বিয়ে না করি তবে সে আত্দহত্যা করবে। আমি ভীষণ ভয় পেলাম। ভয় পেলে মানুষ বেকুবের মতো আচরণ করে, বোকা হয়ে যায়। আমার অবস্থাও তদ্রূপ হলো। আমি আমার স্ত্রীর কাছে সব খুলে বললাম। আর যায় কোথায়, শুরু হলো তুফান। সবকিছু ধ্বংস হয় হয় অবস্থা। এরই মধ্যে অনামিকা আমার অফিসে আসা বন্ধ করে দিল। তখন তো আর মোবাইল ছিল না। আমি ইডেন কলেজে দেখা করতে গেলাম। দেখা হলো না। কিন্তু একটি চিরকুট পেলাম। সে লিখেছে- 'এই কয়দিন তোমার সঙ্গে চলাফেরা করে তোমাকে জানার ও বোঝার চেষ্টা করেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তুমি অনেক বড় হবে, বিখ্যাত হবে এবং সম্পদশালী হবে। অন্যান্য সফল মানুষের মতো তুমিও তাড়াতাড়ি মরবে। আর তোমার মৃত্যুর পরই শুরু হবে আমার দুর্ভোগ। তোমার পরিবারের সবাই তোমার প্রথম স্ত্রীর পক্ষ নেবে এবং আমাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে। অন্যদিকে আমি আমার বাবা-মার পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন থাকব। ওই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না আমার। কাজেই তোমার আমার বিয়ের স্বপ্ন এখানেই শেষ। বিদায়।'

প্রকাশ : ২শে সেপ্টেম্বর ২০১২, বাংলাদেশ প্রতিদিন

স্রষ্টার সৌজন্যবোধ এবং সৃষ্টির নোংরামি

স্রষ্টা মানে আল্লাহ। হিন্দুরা বলেন ভগবান। খ্রিস্টানরা বলেন গড। পারসিক অগি্ন উপাসকরা বলত খোদা। এগুলো মূলত মৌলিক নাম। এর বাইরেও দেশে দেশে সখ্য গুণবাচক নাম রয়েছে। আলোচ্য লেখায় আমরা আল্লাহ শব্দটি ব্যবহার করব।

সব ধর্মের বিশ্বাসীরাই মনে করেন জগৎসমূহের সৃষ্টিকর্তা হলেন আল্লাহ। এ অনন্ত মহাবিশ্বের সব প্রাণী ইচ্ছায় হোক কিংবা অনিচ্ছায় হোক আল্লাহর আওতার বাইরে যেতে পারে না। আল্লাহ তার সৃষ্টির মধ্যেই স্বকীয় সত্তায় উপস্থিত। চিন্তাশীলদের কাছেও তিনি সমুজ্জ্বল। তিনি তার সৃষ্টির মধ্যে কর্মকুশলতায়, সৌন্দর্য, সৌকর্য এবং সৌজন্যবোধের অপার মহিমায় এমনভাবে ভাস্বর হয়ে আছেন যা মানুষমাত্রই বুঝতে পারে এবং সে মতে তারা তাদের কর্মপদ্ধতি ঠিক করে নেয়। আল্লাহ তাদেরকেই বলেছেন দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকামী মানুষ।

আমাদের রাজনীতি, সমাজনীতি এবং পারিবারিক মূল্যবোধের জায়গাটি বার বার আঘাতপ্রাপ্ত হয় প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিবর্গের দ্বারা। যিনি ক্ষমতাশালী প্রধান ব্যক্তিতে পরিণত হন, তার প্রধান ও প্রথম দায়িত্বই হয় অপরাধ, অপমান ও লাঞ্ছিত করে আত্দতৃপ্তি লাভের অপপ্রয়াস চালানো। ফলে একজন বড় হতে থাকে এবং অন্যরা ছোট হতে থাকে। বড় হতে হতে তার আকাঙ্ক্ষা আকাশের মালিক হওয়ার স্বপ্ন পর্যন্ত পেঁৗছে। অন্যদিকে যিনি ছোট হন, তিনি ছোট হতে হতে পা লেহনকারী কুকুর না হয়ে ক্ষান্ত হন না। প্রথমে বাধ্য হয়ে হয়তো ছোট হন কিন্তু পরে ইচ্ছা করেই ছোট হন। নিজেকে বড় করার জন্য মানুষের সবচেয়ে জঘন্য হাতিয়ার হলো অত্যাচার। কখনো অত্যাচার করা হয় অস্ত্রের মাধ্যমে আবার কখনো করা হয় ঘুষের মাধ্যমে। আল্লাহপাক আমাদের জিহ্বা তৈরি করেছেন একখণ্ড নরম ও সাবলীল মাংস দিয়ে। কিন্তু আমরা এই নরম জিহ্বা দিয়ে প্রায়ই কুড়াল, কোদাল কিংবা তরবারির কাজ করে থাকি।

হিন্দুরা যে তেত্রিশ কোটি দেবতা বিশ্বাস করে থাকেন তাদের অন্যতম শ্রীকৃষ্ণ। মহাভারতে আমরা শ্রীকৃষ্ণের উপাখ্যান জেনেছি। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, মানুষ অত্যাচার করতে করতে এক সময় নিজেকে ভগবান ভাবতে শুরু করে। অন্যদিকে মানুষ অত্যাচারিত হতে হতে যখন আর কোনো আশ্রয় পায় না তখন অত্যাচারীদের ভগবান ভাবতে শুরু করে। পরিস্থিতি যখন এরূপ হয় তখনই অবতার হিসেবে আমি আবির্ভূত হই। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব হয়। এখানে আবির্ভাব অর্থটি রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ কখনো সশরীরে স্রষ্টার প্রতিনিধি আসেন আবার কখনো স্রষ্টার বিচার জমিনে আবির্ভূত হয়। ইংরেজিতে আমরা এ বিচারকে বলি Devine Justice। জমিনে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করে মন্দ শাসকরা। তারা তাদের অযোগ্য সঙ্গী-সাথীদের দ্বারা যুগপৎভাবে বহুমুখী অত্যাচারের মাধ্যমে জনজীবন অতিষ্ঠ করে তোলেন। মন্দ শাসকের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তার অযোগ্য সঙ্গী-সাথী বা পাত্রমিত্র। আর এখানেই আল্লাহর শিক্ষা কিন্তু ভিন্ন। প্রকৃতিতে আল্লাহ তার সৃষ্টির মধ্যে এমন ইকো ব্যালেন্স করেছেন যে, সহজেই তার মাহাত্দ্য, সৌন্দর্যপ্রিয়তা এবং সৌজন্যতার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠে। উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে।

প্রকৃতির অন্যতম সৌন্দর্য হলো ফুল। সৌন্দর্যমণ্ডিত পুষ্পকাননে পুরুষ ফুল এবং স্ত্রী ফুলের মধ্যে পরাগায়ন ঘটানোর জন্য আল্লাহ প্রজাপতিকে নিয়োগ করেছেন। ফুলের ওপর যখন হাজার হাজার প্রজাতির প্রজাপতি সকাল-সন্ধ্যা উড়ে বেড়ায় সেই দৃশ্য চিত্রায়িত করে কেউ হলেন মহান চিত্রশিল্পী, চলচ্চিত্রকার কিংবা নিদেনপক্ষে ফটোগ্রাফার। কবিরা অনাদিকাল থেকে কবিতা লিখছেন। লেখকরা লিখছেন গল্প, উপন্যাসসহ হরেক রকম সাহিত্য। অন্যদিকে মানুষের মলমূত্র ধ্বংস করার জন্য আল্লাহপাক যেসব পোকা-মাকড় বা জীবাণু সৃষ্টি করেছেন সেগুলোর আকার-আকৃতি কল্পনা করুন তো! মলমূত্রের পোকা-মাকড় যদি ফুলের পরাগায়ন ঘটাত এবং প্রজাপতি যদি মানুষের মলমূত্র খেত- এ জঘন্য দৃশ্য দেখে কেউ কি আল্লাহর প্রশংসা করত? এবার একটু প্রাণীকুলের দিকে তাকাই। যেসব বন্যপ্রাণী হিংস নয় এবং দেখতে সুন্দর তাদের খাদ্যাভ্যাস, বসবাস করার পদ্ধতি কিন্তু অন্যদের থেকে আলাদা। যেমন হরিণ। কিন্তু যাদের আমরা ঘৃণা করি সেই শূকর কিংবা কুকুর কি কি খায়? তাদের খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাত্রা এবং ব্যবহারই তাদেরকে আমাদের কাছে ঘৃণিত করে তোলে।

এবার মানুষ প্রসঙ্গে আসি। মানুষ যখন তার মানবীয় গুণাবলীর পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে তখন জমিন থেকে আসমান পর্যন্ত তার প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে। জমিনের মানুষ প্রশংসা করে। আসমানে করেন ফেরেশতারা। তিনি যখন জমিনে হাঁটাচলা করেন তখন অপরাপর সৃষ্টি তার জন্য দোয়া করতে থাকে। অথচ এ একই মানুষই যখন মন্দ কাজ করতে করতে এমন পারঙ্গমতা অর্জন করে যে, ইবলিশ শয়তানও স্তব্ধ হয়ে ভাবতে থাকে 'ও' এ শয়তানি শিখল কি করে। মানুষের মধ্যে ইদানীং বিশ্বব্যাপী সমকামিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ সমকামিতা কি জিনিস তা শয়তানও জানে না। এমনকি শিয়াল, কুকুর, গরু-গাধাও সমকামিতা করে না। মানুষের দুটি খারাপ দিক নিয়েই সাধারণত বেশি আলোচনা হয়- একটি আচরণগত, অর্থাৎ ব্যবহারিক। সাধারণ বাংলায় বলে ওর ব্যবহার খারাপ বা চোপা খারাপ। অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে চোখ পাকিয়ে মানুষকে কষ্ট দেয়। অন্যটি হলো আজেবাজে এবং অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে মানুষকে কষ্ট দেয়। লোকে বলে- ওর চোপা খারাপ। অর্থাৎ মুখ খারাপ। কিন্তু মানুষের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো অশ্লীল চিন্তা বা চেতনা। বিশ্বের তাবৎ মাখলুকাত অর্থাৎ সৃষ্টিকূলের মধ্যে কেবলমাত্র মানুষই স্বাধীনভাবে ভালো-মন্দ চিন্তা করার অধিকারী। অবচেতন মনে মানুষ যেসব খারাপ চিন্তা করে তা-ই পরবর্তীতে সে কোনো না কোনোভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। এটা যে কত ভয়াবহ ও জঘন্য হতে পারে তার একটি উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে। এটি সাম্প্রতিককালের বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী কলঙ্কময় ঘটনাগুলোর একটি। ঘটেছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে। একটি অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে কয়েকজন কোরীয় ও চীনা যুবক থাকেন। সামনের ফ্ল্যাটে থাকেন আরব দেশীয় একজোড়া দম্পতি। তাদের ছিল পাঁচ বছরের একটি অনিন্দ্যসুন্দরী কন্যাসন্তান। এ নাবালিকা কন্যাটি প্রতিদিন বিকালে অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সামনের পার্কটিতে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলা করত। কোরীয় ও চাইনিজ যুবকরা প্রায়ই বাচ্চাদের খেলা দেখত এবং এক পর্যায়ে ওই বাচ্চাটির প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হলো। বাচ্চাটির ছন্দময় গতি অসাধারণ সৌন্দর্য এবং সুন্দর স্বাস্থ্যের দিকে তারা বিশেষভাবে নজর দিল। নিজেরা বাচ্চাটিকে নিয়ে অনেক আলোচনা করল এবং মনে মনে ভাবল এই সুন্দর বাচ্চাটির মাংস খেতে না জানি কত মজা লাগবে। যে রকম চিন্তা সেই রকম কাজ। তারা সুযোগমতো বাচ্চাটিকে অপহরণ করল এবং ঠিকই জবাই করে তার মাংস রান্না করল এবং শেষমেশ খেলো। ওই যুবকদের একজনের হঠাৎ করেই পেট ব্যথা শুরু হলো এবং যথারীতি হাসপাতালে নেওয়া হলো। ডাক্তার প্রচলিত ওষুধ দিয়ে কিছুতেই ব্যথা উপশম করতে পারছিলেন না। অবশেষে বমি করানো হলো। ফলে পেটের ভেতর থেকে পরিপাক না হওয়া খাদ্যদ্রব্য বের হয়ে এলো, যার মধ্যে ছিল ওই শিশুটির মাংস। পরবর্তীতে ডাক্তাররা পরীক্ষার মাধ্যমে যখন জানতে পারলেন, মাংসের টুকরাগুলো মানুষের তখন পুলিশে খবর দিলেন এবং আসল সত্য এমনি করেই প্রকাশ হয়ে পড়ল বিশ্বব্যাপী।

মানুষের এই চিন্তা এবং আচরণগত ভিন্নতা নির্ণীত হয় এবং নিয়ন্ত্রিত হয় জিনের মাধ্যমে। জিন মানে এক ধরনের জীব কোষ, যা কিনা হাজার হাজার বছর ধরে মানব শরীরে বংশপরম্পরায় বাহিত হয়ে থাকে। এ জন্য বড় কোনো পদ বা পদবিতে ভালো বংশের লোক খোঁজা হয়। কারণ জেনেটিক থিওরি অনুযায়ী ভালো জিনের অধিকারী মানুষ খারাপ কাজ করতে পারে না। অন্যদিকে জিনগত ত্রুটি থাকলে মানুষ তার প্রভাবে খারাপ কাজটি এক সময় না একসময় করে ফেলবেই। অপরাধ বিজ্ঞানে (Criminology) একটি অধ্যায় রয়েছে By born Criminal- বাংলায় অর্থ দাঁড়ায় 'যাদের জন্মই হয় অপরাধ করার জন্য'। এই থিওরি মতে, অপরাধীরা তাদের শরীরে অপরাধ-সংক্রান্ত জিন বহন করার পাশাপাশি কিছু বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়ে থাকে। যেমন এদের মুখমণ্ডল, ঠোঁট, আঙ্গুলের আকৃতি, নখ, চোখ, চোখের ভ্রু, পায়ের গঠন ইত্যাদি অস্বাভাবিক হয়ে থাকে। এসব লোক কখনো কখনো পেশাদার অপরাধী হিসেবে কাজ করে আবার কখনো কখনো ভদ্র বেশে সমাজের অপরাপর মানুষের সঙ্গে সাধারণ বেশে মিলে-মিশে থাকে। কিন্তু সময় ও সুযোগ বুঝে সে তার অপরাধমূলক কাজটি ঠিকই করে বসে। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় এ প্রকৃতির মানুষ রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে বসলে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আফগানিস্তানে হঠাৎ করেই একজন পেশাদার ডাকাত রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে বসে। নাম তার দস্যু বাচ্চা ই সাক্কো। এমন অদ্ভুত ঘটনা ইতিহাসে খুব কমই ঘটে। এ ডাকাত যখন আফগানিস্তানের শাসক হলো তখন সারা দেশকে একটি পাগলা গারদ বানিয়ে ফেলল। সে লেখাপড়া জানত না। শহরের আধুনিক জীবনযাপন সম্পর্কেও তার কোনো ধারণা ছিল না। মূলত দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে পথের বাঁকে বাঁকে ওত পেতে থেকে সে ডাকাতি করত। এভাবেই সে হঠাৎ কাবুলে উপস্থিত হয়। সেখানে তখন চলছিল দারুণ বিশৃঙ্খলা। ডাকাত দল হাঁটতে হাঁটতে রাজপ্রাসাদের দিকে এগুতে থাকে এবং কেবলমাত্র ডাকাতির উদ্দেশ্যেই অনেকটা অরক্ষিত প্রাসাদে ঢুকে পড়ে এবং আরব্য উপন্যাসের আলী বাবার মতো সিংহাসনে গিয়ে বসে। কিন্তু সিংহাসনে বসেই সে লাফ দিয়ে সরে আসে। বসার স্থানটিকে আরামদায়ক করার জন্য স্প্রিং লাগানো ছিল। ফলে দস্যু সাক্কো যখন স্প্রিংয়ের গদিওয়ালা সিংহাসনে লাফ দিয়ে বসল তখন গদির ভেতরকার স্প্রিংগুলো তাকে সজোরে ঝাঁকি মারল। ওরে বাবারে বলে সে লাফ দিয়ে সিংহাসন থেকে সরে এলো। মনে করল সিংহাসনের মধ্যে ভূত রয়েছে। ডাকাত সর্দার সাক্কো এবার ভূত দেখার জন্য জিদ ধরল। রাজপ্রাসাদের কর্মচারীরা যতই অনুনয়-বিনয় করে তাকে গদির ভেতরকার স্প্রিংয়ের কথা বলল, ততই ভূত সম্পর্কে তার সন্দেহ বাড়ল। সে হুকুম করল সিংহাসনের গদি কেটে টুকরা টুকরা করে ভেতরের ভূত বের করে আনার জন্য। হুকুম তামিল হলো- ফোম, তুলা এবং স্প্রিং বের করে আনার পরও ডাকাত সর্দারের সন্দেহ দূর হলো না।

By born Criminal-এর রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের একটি ঘটনা ঘটেছিল ফ্রান্সে। এটিও অপরাধ বিজ্ঞানের পাঠ্য একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। যিনি রাজ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেন, তিনি বংশপরম্পরায় একজন পাকা এবং দাগি চোর ছিলেন। রাজা হওয়ার পরও তার চুরির অভ্যাস গেল না। তার কাছে আগত অন্য অঞ্চলের রাজা কিংবা রাজ কর্মচারীদের কিছু না কিছু তার চুরি করা চাই-ই। প্রাসাদের মধ্যে রাতের অাঁধারে ঘুরে বেড়াতেন চুরি করার জন্য। প্রাসাদরক্ষী কিংবা অন্দর মহলের দাসীবান্দীদের জিনিসপত্রও চুরি করতেন। যেহেতু রাজা স্বয়ং চুরি করছেন সেহেতু সবাই না দেখার ভান করত। রাজা মনে মনে নিজের চুরিবিদ্যা সম্পর্কে খুবই আস্থাশীল হয়ে পড়লেন। কারণ কেউ তার চুরি ধরতে পারেনি বলেই তার বিশ্বাস। এবার তিনি প্রাসাদের বাইরে চুরি আরম্ভ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। রাজার পাত্র-মিত্ররা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। তারা অনেক পরামর্শ করে একটি ক্ষতিপূরণ প্রদান কমিটি করল যার প্রধান দায়িত্ব হবে রাজা যেসব স্থানে চুরি করবেন সেসব স্থানে আগেই সতর্ক করে দেওয়া। ফলে তারা রাজার চুরির কর্মে কোনো বাধা প্রদান করবে না। বিনিময়ে ক্ষতিপূরণ কমিটি থেকে প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ পাবে। অন্যদিকে রাজা এসবের কিছুই জানল না। মনের আনন্দে রাজা চুরি করতে বের হতো হররোজ। বিশেষ করে বড় বড় বিপণিবিতানগুলো ছিল তার লক্ষ্যস্থল। ক্ষতিপূরণ কমিটির লোকজনও তাকে অনুসরণ করত ছায়ার মতো। একদিকে রাজা চুরি করতেন, অন্যদিকে ক্ষতিপূরণ কমিটির লোক চুরির স্থান, মাল ইত্যাদির তালিকা তৈরি করে যথাযথ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করত। সমসাময়িক রাজনীতিতে এটি কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা না হলেও অপরাধ বিজ্ঞানের একটি মজাদার অধ্যায় হিসেবে অপরাধ বিজ্ঞানীদের জ্ঞানের খোরাক জোগাচ্ছে। এবার আসি আল্লাহর সৌজন্যবোধ প্রসঙ্গে। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন আশরাফুল মাখলুকাত বা সেরা জীব হিসেবে। শারীরিক গঠন এবং চিন্তা-চেতনার উকৃষ্ট রূপের জন্যই মানুষ শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তার ইচ্ছামাফিক ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় সৃষ্টি করেছেন। রাজনৈতিক ক্ষমতা, বংশ এবং বিত্ত-বৈভবের মাধ্যমে কাউকে কাউকে বিশেষভাবে মর্যাদাবান করেছেন। আল্লাহ একবার যাকে মর্যাদাবান করেন তাকে অমর্যাদাকর অবস্থায় ফেলেন না যতক্ষণ না পর্যন্ত ওই ব্যক্তি তার নিজস্ব কর্মযোগে নিজের পতন না ডেকে নিয়ে আসেন। আর এখানেই মানব চরিত্রের এক অদ্ভুত দিক উন্মোচিত হয়েছে সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে।

মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো কারও না কারও কাছে মাথানত করা। আরবিতে একে বলা হয় এজহারে তাজাল্লুল। এই মাথা যদি আল্লাহর কাছে নত হয় তাহলে বিশ্বভুবনে মানুষের তেমন কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু মাথাটি যদি আল্লাহর কোনো বান্দার কাছে নত হয় তখনই শুরু হয় বিপত্তি। যিনি নত করেন তিনি আর সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ থাকেন না। হয়ে যান মানুষরূপী অন্য কিছু। অন্যদিকে যার কাছে নত করা হয় তিনি এ আনুগত্য পেতে পেতে তার নফসের খপ্পরে পড়ে যান। যাকে বলা হয় নফসে আম্মারা। শয়তানের চেয়েও ভয়ঙ্কর এই নফসটি। ফলে ক্ষমতাবান লোকটি এক সময় নিজেকে মহাক্ষমতাধর ভাবতে থাকেন। পৃথিবীর অনেক শাসক এভাবেই নিজেকে একসময় প্রকাশ্যে আল্লাহ বলে ঘোষণা করেছিল। পরিণতি জঘন্যভাবে পতন। মানুষের মধ্যে যারা সাধারণত সুপার কোয়ালিটির হন তারাই কিন্তু এ বিপত্তিতে পড়েন। ইতিহাসের ফেরাউন, ফাতেমী সম্রাট আল মুইজ কিংবা ভারতের সম্রাট আকবর- তারা সবাই কিন্তু মানুষ এবং শাসক হিসেবে ছিলেন অতি উত্তম।

শাসকদের একমাত্র আরাধ্য থাকে- সবার কাছ থেকেই সীমাহীন আনুগত্য লাভের আকাঙ্ক্ষা। বিশেষ করে সর্বজন শ্রদ্ধেয়, জ্ঞানী এবং যোগ্য মানুষের আনুগত্য তাদের খুবই পছন্দ। কিন্তু জ্ঞানী ও সাধু লোকেরা আবার কারও আনুগত্য করতে চান না। ফলে পৃথিবীর রাজনীতির ইতিহাসে সৎ সজ্জন ও জ্ঞানী লোকদের সঙ্গে শাসকদের দ্বন্দ্ব-চিরায়ত একটি উপাখ্যান। ফলে শাসকদের দ্বারা অনেক পণ্ডিত ও সাধু ব্যক্তি নিগৃহীত বা ক্ষেত্রবিশেষে নিহত হয়েছেন। আবার
Devine Justice-এর পাল্লায় পড়ে অনেক শাসক হারিয়েছেন জীবন, রাজ্যপাটসহ সবকিছু। ইতিহাসের একটি সত্য ঘটনা বলে লেখাটি শেষ করব।

সময়টি ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। দিল্লী
তে তখন তুঘলক বংশের প্রতিষ্ঠাতা গিয়াস উদ্দিন তুঘলকের রাজত্ব। তার পুত্র মুহাম্মদ বিন তুঘলক ইতিহাসের পাগলা রাজা নামে সমধিক পরিচিত। ওই যুগে দিল্লীতে বাস করতেন বিখ্যাত দরবেশ নিজাম উদ্দিন আউলিয়া, পুরনো দিল্লীর মেহরুলিতে তিনি বহু বছর ধরে বাস করছিলেন সেই সম্রাট গিয়াস উদ্দিন বলবনের আমল থেকে। সুলতান বলবন থেকে সুলতান গিয়াস উদ্দিন তুঘলক পর্যন্ত কত সম্রাট এলো আর গেল সেই হিসাব নিজাম উদ্দিন আউলিয়া রাখতেন না। সব শাসকের একমাত্র আরাধ্য ছিল নিজাম উদ্দিন আউলিয়াকে দরবারে এনে আনুগত্য দাবি করা। কিন্তু দরবেশ কোনো শাসকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দরবারে যেতেন না। আবার শাসকরাও তাকে বিরক্ত করার সাহস দেখাতেন না। এভাবেই চলছিল। কিন্তু সম্রাট গিয়াস উদ্দিন তুঘলক সিংহাসনে বসেই ঘটালেন ব্যতিক্রমী ঘটনা। তিনি দরবেশকে সমন দিলেন দরবারে উপস্থিত হয়ে আনুগত্য প্রকাশের জন্য। দরবেশ এলেন না। সম্রাট সিদ্ধান্ত নিলেন হাতকড়া পরিয়ে দরবেশকে গ্রেফতার করে টানতে টানতে দিলি্লর দরবারে নিয়ে আসবেন। এর মধ্যেই হঠাৎ করে খবর এলো দোয়ার অঞ্চলের কৃষকরা বিদ্রোহ করেছে। সম্রাট সসৈন্যে বিদ্রোহ দমনে বেরিয়ে পড়লেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যে তিনি সফলতার সঙ্গে বিদ্রোহ দমন করে দিলি্ল অভিমুখে রওনা করলেন এবং রাজধানীর ২০ মাইল দূরবর্তী একটি এলাকায় তাঁবু গাড়লেন। সম্রাট এবার দিলি্লর কোতোয়াল অর্থাৎ পুলিশপ্রধানকে নির্দেশ পাঠালেন নিজাম উদ্দিন আউলিয়াকে গ্রেফতার করে পরের দিন রাজদরবারে হাজির করার জন্য। সম্রাটের উদ্ধত অহংকার দোয়ারের যুদ্ধজয়ের কাল বহু গুণে বৃদ্ধি পেল এবং এই উচ্ছ্বাস তিনি উপভোগ করতে চাইলেন দরবেশকে অপমানিত ও নির্যাতন করার মাধ্যমে।

সম্রাটের আদেশ পেয়ে দিলি্লর পুলিশপ্রধান শুরু করলেন কান্না। কারণ তিনি ছিলেন দরবেশের ভক্ত। কাঁদতে কাঁদতে তিনি দরবেশের দরবারে সম্রাটের ফরমান নিয়ে উপস্থিত হলেন। দরবেশ সব শুনলেন এবং নির্লিপ্ত রইলেন, কোনো জবাব দিলেন না। উৎকণ্ঠিত পুলিশপ্রধান আরজ করলেন হুজুর, সম্রাট দিল্লী
থেকে মাত্র ২০ মাইল দূরে অবস্থান করছেন। কাল সকালের মধ্যেই রাজধানীতে এসে পেঁৗছবেন! এখন আমি কি করব। হুজুর উত্তর করলেন- চিন্তা কর না বেটা। বাড়ি যাও নিশ্চিন্তে ঘুমাও, দিল্লী বহুৎ দূর হ্যায়

পরবর্তী ইতিহাস সবারই জানা। সম্রাট খুব ভোরে দিল্লী
র উদ্দেশে রওনা দিলেন। সম্রাটের পুত্র জুনা খান ওরফে মুহাম্মদ বিন তুঘলক তার যুদ্ধজয়ী পিতাকে বিপুলভাবে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য রাজধানীর উপকণ্ঠে বিশাল ও বর্ণিল তোরণ নির্মাণ করে হাজার হাজার দিলি্লবাসী নাগরিক, সৈন্য সামন্ত ও উজির-নাজিরদের নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। সম্রাট এলেন। যেই মুহূর্তে তিনি সেই বিশাল তোরণ অতিক্রম করছিলেন সেই মুহূর্তেই তা সম্রাটের মাথার ওপর ভেঙে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গেই সম্রাটের মৃত্যু হলো। দিল্লী তার কাছ থেকে দূরেই থেকে গেল।

লেখক : গোলাম মাওলা রনি, এমপি
প্রকাশ : ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০১২, বাংলাদেশ প্রতিদিন